সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রচলনের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন
একুশে ফেব্রুয়ারি এলে আমরা মাতৃভাষা বাংলার প্রতি ভালোবাসার প্রকাশ ঘটাই; কিন্তু আমাদের সারা বছরের কাজকর্মে সেই আবেগের প্রকাশ থাকে না। বিশ্বায়নের অন্তর্ভুক্ত অনেক জাতিই তো নিজ নিজ মাতৃভাষার ব্যবহার ও মর্যাদা অক্ষুণ্ন রেখে দেশি-বিদেশি যোগাযোগের কাজ সম্পন্ন করে চলেছে। ইংরেজিসহ কয়েকটি ঔপনিবেশিক ভাষার আন্তর্জাতিক প্রভাব সত্ত্বেও এশিয়ায় চীনা, জাপানি, কোরীয়, থাই, তামিল, তেলেগু, হিন্দি ভাষার মানুষরা নিজ নিজ মাতৃভাষার উৎকর্ষ সাধন করে চলেছে।
আমাদের শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর অনেকে বাংলা ভাষার চেয়ে ইংরেজির মর্যাদা বেশি দেন। আজকের বাংলাদেশে এমনকি সাহিত্য-শিল্প-সংস্কৃতি জগতের সামর্থ্যবান পরিবারগুলোও কেন সন্তানদের জন্য ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেই শ্রেয় মনে করছে। বাংলা ভাষা নিয়ে আমাদের গৌরবের প্রকাশ ঘটতে পারত রাষ্ট্র ও সমাজের সর্বস্তরে এই ভাষার প্রচলনের মাধ্যমে। কিন্তু বাস্তবে তা ঘটেনি। শিক্ষা ক্ষেত্র, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গনে বাংলা ভাষা অবহেলার শিকার। সামাজিকভাবে বিভিন্ন অনুষ্ঠান-আপ্যায়নের নিমন্ত্রণপত্র থেকে শুরু করে দোকানপাটের পণ্য বিক্রির তালিকা কিংবা অর্থ লেনদেনের রসিদে পর্যন্ত বাংলা ভাষার ব্যবহার প্রতিষ্ঠা পায়নি।
এসব আত্মজিজ্ঞাসা শুধু ফেব্রুয়ারি মাসের বিষয় নয়। তবে একুশে ফেব্রুয়ারিতে ভাষাশহিদদের স্মরণের পাশাপাশি এসব জিজ্ঞাসাও আমাদের তাড়িত করে। আমাদের শিক্ষা কার্যক্রম, প্রতিষ্ঠান পরিচালনাসহ সব কাজে বাংলা ভাষাকে স্বয়ংসম্পূর্ণতার পথে নিয়ে যেতে হবে। সে জন্য উপযুক্ত পরিভাষা কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। একটি মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন ও তা বাস্তবায়নের মাধ্যমে সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রচলনের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা লাভের পর দীর্ঘ প্রায় পাঁচ দশকেও আমরা এ কাজে কেন বেশি অগ্রসর হতে পারিনি, তা আজ আমাদের ভেবে দেখতে হবে। সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রচলনের মাধ্যমেই ভাষাশহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন সম্ভব। শুধু বাংলা নয়, বাংলাদেশ ভূখণ্ডে আরও যে ভাষার মানুষ আছে, তাদেরও নিজ নিজ মাতৃভাষার বিকাশের উদ্যোগ বেগবান করার উদ্যোগ নিতে হবে।

Join the conversation