অভ্যন্তরীণ পর্যটনে সুসময়
করোনাপরবর্তী সময়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছে দেশের পর্যটন খাত। দিনকে দিন পর্যটন স্পটগুলোতে ভ্রমণপিপাসুদের ভিড় বেড়েই চলেছে। পর্যটকদের এমন ভিড়ে হাসি ফুটেছে পর্যটন ব্যবসায়ীদের মুখে কিন্তু এই ভিড় সামাল দিতে পারছেন না সংশ্লিষ্টরা।
করোনাপরবর্তী সময়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছে দেশের পর্যটন খাত। দিনকে দিন পর্যটন স্পটগুলোতে ভ্রমণপিপাসুদের ভিড় বেড়েই চলেছে। পর্যটকদের এমন ভিড়ে হাসি ফুটেছে পর্যটন ব্যবসায়ীদের মুখে কিন্তু এই ভিড় সামাল দিতে পারছেন না সংশ্লিষ্টরা। পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে আবাসন সংকট, রেস্তোরাঁ ও যানবাহনসহ সব ক্ষেত্রেই অতিরিক্ত অর্থ আদায় ছাড়াও নানা হয়রানি ও ভোগান্তির শিকার হতে হয় পর্যটকদের।
পর্যটন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সারা দেশে ১১৯টি পর্যটন স্পট রয়েছে। এই খাতে প্রায় ৪০ লাখ লোক কাজ করে। বছরে প্রায় ২ কোটি লোক দেশের পর্যটন স্পটগুলোতে ভ্রমণ করে। বছরে আয় হয় ৩০০ কোটি টাকারও বেশি। দেশে শত শত পর্যটন স্পট থাকলেও শতভাগ পর্যটন সেবা পান না পর্যটকরা। রয়েছে যোগাযোগ ও আবাসন ব্যবস্থার ঘাটতি। নেই পর্যটকদের দেশীয় সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার যথাযথ ব্যবস্থা।
তারা বলছেন, বছর শেষে স্কুলের ছুটি, নতুন বর্ষবরণের আমেজ, সাপ্তাহিক ছুটি ও বড়দিনসহ টানা তিন দিনের ছুটি, সব মিলিয়ে গত এক সপ্তাহে দেশের পর্যটন এলাকায় ঘুরতে গেছেন কয়েক লাখ মানুষ। পর্যটন স্পটগুলোতে এখন বিরাজ করছে উৎসবের আমেজ। তবে বাড়তি চাপে বিভিন্ন সময়ে বিপত্তিতে পড়তে হয় পর্যটকদের। তাদের নিরাপত্তা দিতে বেগ পেতে হয় প্রশাসনের। অন্যদিকে আবার অনেক পর্যটক হোটেল রুম বুক না করেই বিভিন্ন গন্তব্যে চলে যান। এরপর হোটেলে ফিরে রুম না পেয়ে তাদের বিপত্তিতে পড়তে হয়।
পর্যটকদের অভিযোগ, পর্যটনের এই মৌসুমে দেশের বিভিন্ন স্থানে রেস্তোরাঁয় অতিরিক্ত দাম রাখা হয়। শুধু রেস্তোরাঁ নয়, রিকশা, নৌকা, অটোরিকশা ভাড়া ও পর্যটন স্থানের বিভিন্ন দোকানে পণ্যের দামও হাঁকা হয় বাড়তি। এমনকি ভিক্ষুকের উৎপাতও লক্ষণীয়।
পর্যটন ব্যবসায়ীরা বলছেন, পর্যটক বৃদ্ধি এই শিল্পের জন্য সুখবর। যে হারে পর্যটক বাড়ছে সেভাবে অবকাঠামোর উন্নয়ন হয়নি। যতটুকু আছে তা উপচে পড়া ভিড় সামাল দেওয়ার জন্য অপ্রতুল। তাই ছুটির দিনে পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে অতিরিক্ত পর্যটকের চাপ সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এ ছাড়া পর্যটকরা বেছে বেছে কয়েকটি পর্যটন স্পটে ভিড় করায় ভোগান্তি বাড়ে। এখন মানুষের হাতে টাকা আছে, বেড়াতে গিয়ে ভোগান্তির শিকার হলে দেশীয় পর্যটকদের আশপাশের দেশে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। এতে দেশের অর্থ বিদেশে চলে যাবে। যত বেশি পর্যটক বাড়বে তত বেশি এই খাতে বিনিয়োগ হবে, অবকাঠামো ও যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন হবে। দেশের পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে পর্যটক ধরে রাখতে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।
বছরব্যাপী বিশেষ করে ছুটির দিনগুলোতে দেশের কক্সবাজার, রাঙ্গামাটি-বান্দরবান, সিলেট, সুন্দরবন ও কুয়াকাটায় সবচেয়ে বেশি পর্যটক ভ্রমণ করেন। দীর্ঘদিন পর টানা ছুটিতে আশানুরূপ পর্যটক আসায় খুশি পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। বড়দিনসহ টানা তিন দিনের অবকাশে এসব স্পটে নেমেছে মানুষের ঢল। তাদের জায়গা দিতে হিমশিম খায় হোটেল, মোটেল ও রেস্তোরাঁগুলো। জানুয়ারি মাস পর্যন্ত পর্যটকদের চাপ থাকবে বলে আশা প্রকাশ করেন ব্যবসায়ীরা।
কক্সবাজার হোটেল-মোটেল ও গেস্ট হাউস মালিক সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবদুর রহমান বলেন, টানা ছুটিতে প্রায় সাড়ে ৩ লাখ পর্যটক এসেছেন। কক্সবাজারের সাড়ে ৪ শতাধিক হোটেল-মোটেল ও গেস্ট হাউস-কটেজের কক্ষ খালি নেই। তাই নতুন করে আসা পর্যটকদের কক্ষ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না বিধায় তারা দুর্ভোগের শিকার হন।
বান্দরবানের নীলাম্বরী রিসোর্টের মালিক সাইদুল ইসলাম জানান, টানা তিন দিনের ছুটি উপলক্ষে পর্যটকদের আশানুরূপ আগমন ঘটেছে। পর্যটকদের এমন আগমন অব্যাহত থাকলে আগের ক্ষতি অনেকটাই পুষিয়ে নিতে পারবেন বলে প্রত্যাশা করেন তিনি।
সিলেটের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মোহাম্মদ মোবারক হোসেন বলেন, সিলেটের বিভিন্ন পর্যটন স্থানে পর্যটকদের নিরাপত্তার বিষয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। যেকোনো স্থানে পর্যটকরা যেন নির্বিঘ্নে ভ্রমণ করতে পারেন, সেটি নিশ্চিত করতে সবার সঙ্গে সমন্বয় করা হয়েছে। যেসব উপজেলায় পর্যটনকেন্দ্র আছে, সেসব উপজেলার ইউএনওদের সতর্ক থাকতেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ট্যুরিস্ট পুলিশও নিরাপত্তার জন্য কাজ করছে।
বান্দরবান ট্যুরিস্ট পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নকিবুল ইসলাম জানান, আগত পর্যটকদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সব স্পটে সাদা পোশাকেও পুলিশ নিয়োজিত আছে। পর্যটকদের নিরাপত্তার জন্য সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
করমজল পর্যটন ও বন্যপ্রাণী প্রজনন কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হাওলাদার আজাদ কবির বলেন, সাপ্তাহিক ও বড়দিনের টানা ছুটিতে করমজলে পর্যটকদের ভিড় বেড়েছে। ছুটির প্রথম দিন শুক্রবারে প্রায় ২ হাজার পর্যটক বা দর্শনার্থী এসেছেন এখানে। ছুটির এই তিন দিনে উল্লেখযোগ্য রাজস্বও আয় হয়েছে। করমজল ছাড়া সুন্দরবন বিভাগের অন্যান্য পর্যটন স্পটেও পর্যটকদের ভিড় হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
সুন্দরবন অঞ্চলের বন সংরক্ষক (সিএফ) মিহির কুমার দে বলেন, সুন্দরবনে করমজল ছাড়াও হিরণ পয়েন্ট, হারবাড়িয়া, কটকা, কচিখালী, কলাগাছি ও দোবেকি পর্যটন স্পটে পর্যটকদের আনাগোনা বেড়েছে। বেশি পর্যটক হচ্ছে করমজলে।
ট্যুরিস্ট পুলিশের ডিআইজি মো. ইলিয়াস শরিফ বলেন, নভেম্বর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত পর্যটন মৌসুম। এ সিজনে দেশের সব পর্যটন স্থানে মানুষের চাপ বাড়ে। এ সময়ে মানুষজন যখন ছুটিতে থাকে, আমাদের সদস্যদের কোনো ছুটি থাকে না। পর্যটকদের নিরাপত্তায় সবসময়ই আমাদের সর্বোচ্চ নজরদারি থাকে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের বিভিন্ন জায়গায় পর্যটন কেন্দ্র গড়ে উঠলেও পরিবেশবান্ধব করা যাচ্ছে না। নানা উন্নয়নের নামে গাছ কেটে ধ্বংস করা হচ্ছে পরিবেশ। শব্দদূষণ, পরিবেশ দূষণ তো আছেই। নিশ্চিত করা হয়নি কোনো আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। যত্রতত্র ময়লা ফেলার কারণে পলিথিনের ভাগাড়ে রূপ নিচ্ছে দেশের বিভিন্ন পর্যটন কেন্দ্র। প্রকৃতির দেওয়া সম্পদ রক্ষা করতে পারলে নতুন কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে, জিডিপিতেও রাখবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। পরিবেশবান্ধব পর্যটন গড়ে তুলতে এই খাতে সরকারের বিনিয়োগ আরও অনেক বাড়ানো দরকার।
ট্যুর অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (টোয়াব) সভাপতি মো. রাফেউজ্জামান সময়ের আলোকে বলেন, একটা পর্যটন স্পট মানে অসংখ্য লোকের কর্মসংস্থান। যেকোনো ইন্ডাস্ট্রি কোনো না কোনো দূষণ করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে। কিন্তু পর্যটন শিল্প কোনো রকম দূষণ ছাড়াই বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে। এখন কিছু মানুষের হাতে পয়সা আছে, অভ্যন্তরীণ ট্যুরিজমকে গুরুত্ব না দিলে এই পর্যটকরা আশপাশের দেশে চলে যাবেন। তখন ফরেন কারেন্সি বেরিয়ে যাবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ এখন বিশ্বের মধ্যে তৃতীয় বৃহৎ পর্যটন শিল্পের দেশ। আমরা চাই দেশি পর্যটকরা যেন দেশেই ভ্রমণ করে, বিদেশিরাও আসে। এ জন্য সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির প্রতি গুরুত্ব দিচ্ছি আমরা। অভ্যন্তরীণ ট্যুরিজমে যত বেশি চাহিদা তৈরি হবে অবকাঠামোসহ সব উন্নয়ন তত দ্রুত বৃদ্ধি পাবে। বিনিয়োগকারীরা এই খাতে আগ্রহী হবে। কক্সবাজারে রেল চালু হয়ে গেলে যোগাযোগের সমস্যা অনেকটাই কেটে যাবে।
তিনি বলেন, কক্সবাজারে এই তিন দিনের ছুটিতে প্রায় ৫ লাখ পর্যটক গেছেন। একসঙ্গে এত মানুষকে আবাসন সুবিধা দেওয়ার ক্ষমতা আমাদের তৈরি হয়নি। হাতে গোনা কয়েকটি ট্যুরিস্ট স্পটে পর্যটকরা বেশি যান, এটাও একটা প্রতিবন্ধকতা।
