09:33:47 pm
Sunday, June 21

টিকেট নেই অথচ ২৩ শতাংশ আসন খালি বিমানের

আন্তর্জাতিক রুটে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের টিকেট মেলে না- প্রায়ই এমন অভিযোগ পাওয়া যায়। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, টিকেট পাওয়া না গেলেও গত ছয় মাসে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক রুটে পরিচালিত ফ্লাইটে ২৩ শতাংশ আসন খালি ছিল রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী এয়ারলাইন্সটির।

আন্তর্জাতিক রুটে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের টিকেট মেলে না- প্রায়ই এমন অভিযোগ পাওয়া যায়। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, টিকেট পাওয়া না গেলেও গত ছয় মাসে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক রুটে পরিচালিত ফ্লাইটে ২৩ শতাংশ আসন খালি ছিল রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী এয়ারলাইন্সটির।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চলতি বছরের জুন থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ৬৮টি বিদেশি গন্তব্যে ফ্লাইট পরিচালনা করেছে বিমান। এসব ফ্লাইটে আসনসংখ্যা ছিল ১৪ লাখ ৭৭ হাজার ৪৫৬টি। এর মধ্যে টিকেট বুকিং করা হয়েছে ১১ লাখ ৩৫ হাজার ৯৭৪টি, বাকি ৩ লাখ ৪১ হাজার ৪৮২টি আসন খালি ছিল। সে হিসাবে আসন খালি থাকা সত্ত্বেও গড়ে ২৩ শতাংশ যাত্রী ছাড়াই ফ্লাইট পরিচালনা করা হয়েছে।

অন্যদিকে সব রুটে খালি আসনের চিত্র এক নয়। বেশ কয়েকটি রুটে মাত্র কয়েকটি আসন খালি ছিল, কয়েকটি রুটে অল্প কিছু যাত্রী নিয়ে ফ্লাইট পরিচালনা করা হয়েছে। আবার বেশ কয়েকটি রুটে অর্ধেকের বেশি আসন খালি ছিল। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

গত ছয় মাসে কতগুলো টিকেট বিক্রি হয়েছে তার পরিসংখ্যান এবং যেগুলো বিক্রি হয়নি তার কারণ বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের কাছে জানতে চেয়েছিল বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত সপ্তাহে সংসদীয় কমিটির কাছে গত ছয় মাসের টিকেট বিক্রির তথ্য তুলে ধরে প্রতিবেদন জমা দেয় বিমান।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স কখনোই তার টিকেট বিক্রি সেবা বন্ধ রাখেনি। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক স্টেশনসমূহে নিজস্ব সেলস সেন্টার থেকে বিমানের নিবেদিত কর্মীদের মাধ্যমে টিকেটিং সেবা দিয়ে আসছে। এ ছাড়াও গ্লোবাল ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেমের (জিডিএস) মাধ্যমে টিকেটিং সেবা দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি বিমান কলসেন্টারের মাধ্যমে টিকেট বিক্রি, পুনঃইস্যু, তারিখ পরিবর্তন এবং উচ্চ শ্রেণিতে আপগ্রেডেশনসহ অন্যান্য সেবা দেওয়া যাচ্ছে। 

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স তার প্যাসেঞ্জার সার্ভিস সিস্টেম (পিএসএস) পরিবর্তনের কারণে গত বছরের ৯ আগস্ট থেকে ২৬ চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ওয়েবসাইটে টিকেট বিক্রি বন্ধ রাখে, যা ২৭ ফেব্রুয়ারি থেকে আবার চালু করা হয়। ওয়েবসাইটে টিকেট বিক্রি সাময়িক বন্ধ হওয়ার আগে বিমান তার বিক্রিত টিকেটের অতি সামান্যই (প্রায় ৪.৫০ শতাংশ) ওয়েবসাইটের মাধ্যমে বিক্রি করত। তবে গড়ে ২৩ শতাংশ আসন খালি রেখে ফ্লাইট পরিচালনার কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি সংস্থাটি।
বিমানের ঢাকা-গুয়ানজু রুটে টিকেটের চাহিদা অনেক বেশি। টিকেট ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই শেষ হয়ে যায়, বেশি টাকা না দিলে পাওয়া যায় না ওই রুটের টিকেট। বিমানের টিকেট বিক্রি নিয়ে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ দুদক পর্যন্ত গড়িয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন বিষয়টির তদন্ত করতে বিমানের কার্যালয়েও অভিযান চালায়।

বিমানের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ছয় মাসে ঢাকা থেকে চীনের গুয়ানজু রুটে বিমানের ফ্লাইটে আসন ছিল ২ হাজার ৬৭৫টি। যাত্রী পরিবহন করা হয়েছে ১ হাজার ৩৭ জন। এ সময়ে আসন খালি ছিল ১ হাজার ৬৩৮টি। মোট আসনের বিপরীতে ৬১ শতাংশ আসন খালি রেখেই ফ্লাইট পরিচালনা করা হয়েছে। এ ছাড়া মাস্কাট থেকে ঢাকা রুটে ১৭ হাজার ৬৬৫টি আসন ছিল। এর মধ্যে ৯ হাজার ২৮৫টি আসন বা ৫৩ শতাংশ ফাঁকা ছিল। আবুধাবি-ঢাকা রুটে মোট আসনের ৪৫ শতাংশই ফাঁকা ছিল। 

অন্যদিকে ঢাকা থেকে মাস্কাট, চট্টগ্রাম থেকে মাস্কাট, ঢাকা থেকে রিয়াদ, চট্টগ্রাম থেকে জেদ্দার ফ্লাইটগুলোতে যাত্রী বেশি ছিল। এসব ফ্লাইটে ৮০-৯০ শতাংশ আসন পূর্ণ ছিল।

অ্যাভিয়েশন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অন্য এয়ারলাইন্সের তুলনায় বিমান পরিচালিত রুটে টিকেটের দাম কম হওয়ায় সবসময়ই চাহিদা থাকে। অথচ টিকেট পাওয়া যায় না। এমন পরিস্থিতিতে গড়ে ২৩ শতাংশ আসন খালি রেখে ফ্লাইট পরিচালনা করা অস্বাভাবিক। এর সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা উচিত। এ জন্যই লাভের মুখ না দেখে বিমানের হাজার হাজার কোটি টাকা লোকসান হয়। বিমানের গুটিকয়েক কর্মকর্তা ও এজেন্সির লোকজন এর সঙ্গে জড়িত। আর ক্ষতি হচ্ছে রাষ্ট্রের।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, যেসব রুটে টিকেটের চাহিদা বেশি সেসব রুটের টিকেট বুকিং দেওয়ার জন্য নির্দিষ্ট কয়েকটি এজেন্সিকে সুবিধা দেয় বিমান। ফলে সেসব এজেন্সি ছাড়া টিকেট পাওয়া যায় না। টিকেটের সংকট দেখা দেয়। কিন্তু বুকিং দেওয়া এজেন্সি যেসব টিকেট বিক্রি করতে পারে না নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা দিয়ে সেগুলোর বুকিং বাতিল করে দেয়। ফলে একদিকে টিকেটের সংকট দেখা দেয়, অন্যদিকে বুকিং বাতিল করায় শূন্য আসন নিয়ে ফ্লাইট পরিচালনা করতে হয় বিমানকে।

অ্যাভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম সময়ের আলোকে বলেন, বিমান যেসব আন্তর্জাতি রুটে ফ্লাইট পরিচালনা করে সেসব রুটে টিকেটের চাহিদা অনেক বেশি কিন্তু অভিযোগ পাওয়া যায় টিকেট না পাওয়ার। সেই বিবেচনায় ২৩ শতাংশ আসন খালি থাকা সন্তোষজনক নয়। ১০-১৫ শতাংশ খালি থাকলে ঠিক আছে। কর্তৃপক্ষের এদিকে কঠোরভাবে নজর দেওয়া উচিত।

তবে সদ্যনিযুক্ত বিমানের এমডি ও সিইও শফিউল আজিম দাবি করেছেন, তাদের টার্গেট ছিল গড়ে ৭৪ শতাংশ যাত্রী পরিবহন করা। সেই তুলনায় ৩ শতাংশ বেশি অর্থাৎ ৭৭ শতাংশ যাত্রী পরিবহন করা হয়েছে। তিনি সময়ের আলোকে বলেন, বিমান বাস বা লঞ্চের মতো নয়। বিমানে যাত্রী পরিবহনের ক্ষেত্রে বেশকিছু টেকনিক্যাল বিষয় মানতে হয়। সেন্ট্রাল অব গ্র্যাভিটি মেনে এয়ারলাইন্স চালাতে হয়। যেমনÑযাত্রী সংখ্যা, মালামালের ওজন, ফুয়েলের ওজন এবং কত কিলোমিটার যাবে এসবের সমন্বয়ে লোড ফ্যাক্টর হিসাব করে ফ্লাইট পরিচালনা করা হয়। বেশকিছু রুটে ৮০-৯০ শতাংশ যাত্রীও পরিবহন করা হয়েছে।

তিনি বলেন, আমরা যে পরিসংখ্যান দিয়েছি তা নিয়ে সংসদীয় কমিটি কোনো কথা বলেনি। ২৩ শতাংশ সিট খালি ছিল- এভাবে না দেখে টার্গেটের চেয়ে ৩ শতাংশ বেশি যাত্রী পরিবহন করা হয়েছে- এভাবে দেখা উচিত। জাতীয় বিমান সংস্থার বিরুদ্ধে এভাবে একপাক্ষিক নিউজ করা ঠিক নয়।

বিমানের মাধ্যমে কিছু এজেন্সি সুবিধা ভোগ করে, টিকেট বুকিং দিয়ে সংকট সৃষ্টি করে পরে বুকিং বাতিল করে দেয়- এমন অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, বিমান এগুলো থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে।