09:43:59 pm
Sunday, June 21

শীতের প্রকোপ: শিশু হাসপাতালে রোগী বেড়েছে দ্বিগুণ

এক মাসে আগে সন্তানের মা হয়েছেন গাজীপুরের নাসরিন আক্তার। পরিবারে খুশির রেশ না কাটতেই হঠাৎ শনিবার সকালে তার শিশু অসুস্থ হয়ে পড়ে। তখন শিশু শরীরে তীব্র জ্বর। কিছুক্ষণ পর শুরু হয় শ্বাসকষ্ট।

এক মাসে আগে সন্তানের মা হয়েছেন গাজীপুরের নাসরিন আক্তার। পরিবারে খুশির রেশ না কাটতেই হঠাৎ শনিবার সকালে তার শিশু অসুস্থ হয়ে পড়ে। তখন শিশু শরীরে তীব্র জ্বর। কিছুক্ষণ পর শুরু হয় শ্বাসকষ্ট। দ্রুত জেলা শহরের এক চিকিৎসকের চেম্বারে নেওয়া হয় শিশুকে। কিন্তু চিকিৎসক তাকে ঢাকায় ভর্তির পরামর্শ দেন। দেরি না করে শিশুর মা ছুুটে আসেন ঢাকা শিশু হাসপাতালে। রোববার ভর্তি করান শিশু বিভাগে। ভর্তির পরপরই দেওয়া হয় অক্সিজেন। পরে চিকিৎসকরা জানান তার বাচ্চা নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত। সঠিক সময়ে না আনা হলে বাঁচানো কঠিন হতো। এখনও শিশুটির চিকিৎসা চলছে।

তার মতো একই অবস্থা ছয় মাসের শিশু আবদুল্লাহর। আগে থেকেই অ্যাজমা থাকায় তার অবস্থা একটু বেশিই খারাপ। গত তিন-চার দিন শ্বাসকষ্ট, কাশি আর সর্দি তো আছে সঙ্গে ডায়রিয়া। তার মা রিমা বেগম জানান, ছেলের অবস্থা খুবই খারাপ, শুধুই কান্নাকাটি করে এমনকি বুকের দুধও খায় না। ছেলে সুস্থ হওয়ার জন্য মানতও করেছি কিন্তু ভালো হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখছি না। গত এক সপ্তাহে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে এমন রোগীর সংখ্যাটাই বেশি।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গত তিন মাসে শুধু নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালটিতে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৮৪ জন। এর মধ্যে অক্টোবর মাসে ৩০৮ জন, নভেম্বরে ৩১৩ জন, ডিসেম্বরে ৪৩৭ জন নিউমোনিয়া রোগী ভর্তি হয়েছে। অর্থাৎ এক মাসে ২৫ শতাংশ রোগী বেড়েছে। আর এ মাসের প্রথম দিনে ২৬ জন রোগী ভর্তি হয়েছে। এ ছাড়াও জরুরি বিভাগ থেকে প্রতিদিন গড়ে বেড়েছে ৪০০ ওপরে রোগী সেবা নিচ্ছে। যেখানে জরুরি বিভাগে স্বাভাবিক সময়ে যেখানে রোগী আসত গড়ে ২০০-২৫০ জন।

রোগী ও স্বজনদের অভিযোগ, হাসপাতালে বহির্বিভাগে টিকেট কাটা থেকে শুরু করে ভর্তি হওয়ার পর শয্যা পেতে, এমনকি ছাড়পত্র পেতেও চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়। শুধু বহির্বিভাগই নয়, হাসপাতালের ভেতরে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা এবং তার রিপোর্ট সংগ্রহেও ঝামেলা পোহাতে বলেও জানান তারা।

চিকিৎসকরা জানিয়েছে, শীতের প্রকোপ বাড়ার কারণে গত এক সপ্তাহে ঢাকা শিশু হাসপাতালেই সর্দি-কাশি, ঠান্ডা-জ্বর, হাঁপানি নিয়ে রোগী বেড়েছে দ্বিগুণ। যেসব শিশুর আগে থেকেই অ্যাজমার সমস্যা আছে তারা ভর্তি হচ্ছে হাসপাতালে। পাশাপাশি বাড়ছে শ্বাসকষ্টজনিত রোগসহ নিউমোনিয়া, ব্রংকিউলাইটিস, ডায়রিয়া, ফুসফুসের সংক্রমণ এবং চর্মরোগের রোগীর সংখ্যাও।

তারা বলছেন, অভিভাবকদের অতি অসচেতনতার কারণে নিউমোনিয়ার প্রকোপ বাড়ছে। তাই এই সময় শিশুদের সুরক্ষায় শীত এড়িয়ে চলতে হবে। এ ছাড়াও শীতে শিশুদের হাঁপানি ও নিউমোনিয়া থেকে বাঁচাতে পর্যাপ্ত গরম কাপড়সহ হাতমোজা, পা মোজা পরিয়ে রাখতে হবে। সর্বক্ষেত্রে কুসুম গরম পানি ব্যবহার করতে হবে।

সোমবার সকালে হাসপাতালের বহির্বিভাগে টিকেট কাটতেও দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। শুধু বহির্বিভাগই নয়, হাসপাতালের ভেতরে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা এবং তার রিপোর্ট সংগ্রহেও দীর্ঘ লাইনে চরম ভোগান্তিতে পড়তে দেখা গেছে। এ ছাড়া শয্যা সংকটের কারণে অনেক রোগীকে ফিরে যেতে দেখা গেছে। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত কেউ আসছেন ছয় মাসের শিশুকে নিয়ে, কেউ এসেছেন নবজাতক নিয়ে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের এসব রোগীর বেশিরভাগই ভুগছে ঠান্ডাজনিত নানা রোগে।

হাসপাতালে বহির্বিভাগের সামনে কথা সাভার আসা রুমা আক্তার জানান, টিকেট কেটে এক ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। বাচ্চা কান্না করছে কিন্তু লাইন তো এগোচ্ছে না। কখন বাচ্চাকে দেখাব আর কখন বাসায় যাব?

হাসপাতালে শয্যা না পেয়ে আবদুল মজিদ তার তিন মাসের বাচ্চা মাইদুল ভর্তি করা পারেনি। তিনি জানান, শনিবার থেকেই আমার বাচ্চার সর্দি-কাশি, ঠান্ডা-জ্বর ও শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যায় ভুগছেন। সিরাজগঞ্জ সদর হাসপাতালের চিকিৎসকরা এখানে আসার জন্য রেফার্ড করেছে কিন্তু শয্যা নেই তাই প্রাইভেট হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছি।

হাসপাতালে শিশু ওয়ার্ডে মায়ের কোলে কান্নাকাটি করছেন ইব্রাহিম হোসেন। তার বয়স দুই মাস। চার দিন ধরে এখানে ভর্তি। হাতে ক্যানলা লাগানো আর নাকে স্যালাইনের নল। শ্বাসকষ্ট না কমায় মুখে শিশুটিকে নেবুলাইজার দিয়ে রাখছেন তার মা গোলাপী বেগম।

তিনি জানান, বাচ্চা কিছুই খাচ্ছে না। শুধু কান্নাকাটি আর খিচুনি দিয়ে ওঠে। এই কষ্ট আর সহ্য হচ্ছে না। একে তো টাকা খরচ হচ্ছে তাতে সমস্যা নেই কিন্তু আমার বাচ্চাটার অবস্থা দিন দিন আরও খারাপ হচ্ছে।

ঢাকা শিশু হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেছে, রোগীর চাপ বাড়ায় এখানকার ৬৮০টি শয্যার একটিও বর্তমানে ফাঁকা নেই। এর মধ্যে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ), নবজাতক নিবিড় যত্ন ইউনিট (এনআইসিইউ), পেডিয়াট্রিক ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট (পিআইসিইউ) এবং হাই ডিপেন্ডেন্সি ইউনিটের (এইচডিইউ) সংকট দেখা দিয়েছে। অনেক শিশু রোগীর আইসিইউ প্রয়োজন থাকলেও ফাঁকা না হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দিতে পারছে না। শিশু ওয়ার্ডে রোগী ও স্বজনদের চাপে পা ফেলার জায়গা নেই। অতিরিক্ত রোগীর চাপে পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

শিশু হাসপাতালের একাধিক চিকিৎসকরা জানান, শীতের কারণে ঢাকার বাইরে থেকে রোগী বেশি আসছে। এখন হাসপাতালে প্রতিদিন যত রোগী ভর্তি হচ্ছে তার প্রায় অর্ধেকই নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত। আর যেসব বাচ্চাদের আগে থেকেই শ্বাসকষ্ট ছিল, ঠান্ডার কারণে তাদের সংখ্যাও কম নয়।

বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. জাহাঙ্গীর আলম সময়ের আলোকে বলেন, শীতে প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় রোগীর সংখ্যাও বাড়ছে। বাচ্চাদের জ্বর-সর্দি-কাশি হতেই পারে কিন্তু যখন দেখা যায় জ্বরের সঙ্গে বুকের ভেতরটা দেবে যাচ্ছে এবং বাচ্চার বয়সভিত্তিক যে শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি তার চেয়ে বেশি হচ্ছে। যেমন দুই মাসের নিচে বাচ্চার বয়সের শ্বাসের গতি ৬০-এর বেশি হলে এবং দুই মাস থেকে এক বছরে বয়সের বাচ্চার গতি যদি ৫০ বা তার বেশি হয় তাহলেই ধরে নিতে হবে বাচ্চার নিউমোনিয়া হয়েছে। মা-বাবাদের জন্য এটা একটা সতর্কবাণী। এক মিনিটে শ্বাস-প্রশ্বাসে গতি গণনা করাটা খুব কঠিন কোনো বিষয় নয়। কিন্তু দেখা যাচ্ছে বাচ্চার যখন খুব অবস্থা হয়ে গেছে তখন হাসপাতালে নিয়ে আসে। তখন দেখা যায় শয্যা থাকে না। ভর্তি হতেও সমস্যা হয়। এমনও দেখা গেছে যানজটের কারণে আসতেও দেরি হওয়ায় বাচ্চাটা মারা গেছে। তাই কোনো ধরনের অবহেলা না করে ঠান্ডা-কাশি হলে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে আসা উচিত।

অভিভাবকদের অসচেতনতার কারণে নিউমোনিয়ার প্রকোপ বাড়ছে উল্লেখ ডা. মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, শীতের সময়ে বেশি ছোট বাচ্চাকে ঘরের বাইরে বের না করাই ভালো। আমাদের দেশে মা-বাবারা বাচ্চার ব্যাপারে অতি সচেতন যেমন শীত থেকে বাঁচার জন্য মাথায় ও কানে টুপি দিয়ে রাখেন। তিন-চারটি কাপড় পড়ানোর পড়েও সুয়েটার পড়ানো হয় আবার তার ওপর ওভার কোট পড়ানো হয়। তখন দেখা যায় বাচ্চা ঘেমে যাচ্ছে কিন্তু মা-বাবা তা খেয়াল রাখছে না। তখন বাচ্চার শরীরের ভেতরে ঠান্ডা হয়ে যায়। বাচ্চার রক্ত সাপ্লাই কমে যায় এবং বিভিন্ন ভাইরাস আক্রান্ত করে। ফলে এই অতিসচেতনতা বাচ্চার জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে। তাই শীতের এই সময়ে শিশুদের পুষ্টি সমৃদ্ধ খাবার এবং শাকসবজি বেশি করে খাওয়ানোর পরামর্শ দেন এই চিকিৎসক।