খোঁজই নেয় না দূতাবাসগুলো, আইনি সহায়তা দূরের কথা
বিদেশে বসবাসরত বাংলাদেশিরা হত্যাকাণ্ডের শিকার বা অস্বাভাবিক মৃত্যুর মুখে পড়লে দূতাবাসগুলো কোনো খোঁজখবর নেয় না বা কনস্যুলার সেবা দেয় না। আর আইনি সহযোগিতা করা তো অনেক দূরের বিষয়। বিদেশে এখন পর্যন্ত কতজন বাংলাদেশি
বিদেশে বসবাসরত বাংলাদেশিরা হত্যাকাণ্ডের শিকার বা অস্বাভাবিক মৃত্যুর মুখে পড়লে দূতাবাসগুলো কোনো খোঁজখবর নেয় না বা কনস্যুলার সেবা দেয় না। আর আইনি সহযোগিতা করা তো অনেক দূরের বিষয়। বিদেশে এখন পর্যন্ত কতজন বাংলাদেশি হত্যার শিকার হয়েছেন তার পরিসংখ্যান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পাওয়া যায়নি।
তবে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড এবং বিমানবন্দরের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৮ থেকে ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত দেশের ৩ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে মোট ৪৫ হাজার ৩০১ জন প্রবাসীর মরদেহ দেশে এসেছে। এর মধ্যে ২৭ হাজার ২৩১ জনের (৬৩ শতাংশ) মরদেহ এসেছে মধ্যপ্রাচ্যের ৬টি দেশ থেকে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা মরদেহের ক্ষেত্রে পরিবারগুলো কনস্যুলার সেবা পেয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বস্টন শহরে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশি সৈয়দ আরিফ ফয়সাল চেস্টনাট স্ট্রিটে গত ৪ জানুয়ারি রাতে আমেরিকান পুলিশের গুলিতে নিহত হন। আরিফ যুক্তরাষ্ট্রের দ্য ইউনিভার্সিটি অব ম্যাসাচুসেটস আমহার্স্টের শিক্ষার্থী ছিলেন।
সৈয়দ আরিফ ফয়সালের হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন এ প্রতিবেদককে বলেন, ঘটনাটা আমি জানি। তার বাবার সঙ্গে আমার অনেক দিনের পরিচয়। তারা বস্টন শহরে অনেক বছর ধরে থাকে। ছেলেটাকে আমি চিনি না; কিন্তু তার বাপ-দাদাকে চিনি। তবে ঘটনাটা খুব দুঃখজনক, ছেলেটা খুব তরুণ, বয়স মাত্র ২০, সে বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান এবং খুব ভালো ছাত্র ছিল। তবে তাকে হত্যার বিষয়টি এখনও বুঝতে পারছি না। এ বিষয়ে দুটি ভার্সন পাওয়া যাচ্ছে। একটা হচ্ছে পুলিশের, ওরা বলছে ছেলেটা বাসা থেকে জানালা ভেঙে একটি ছুরি হাতে বের হয়ে যায়, প্রতিবেশীদের কাছে তার ব্যবহারটা আনকমন মনে হয়েছে, তখন তারা পুলিশকে ৯১১ ফোন করেছে। পুলিশ যখন আসছে তখন ছেলেটা দৌড়াচ্ছে খালি গায়ে। এটা খুব স্ট্রেঞ্জ যে খালি গায়ে কেন, পুলিশ বলছে তার হাতে একটি ছুরি ছিল। আবার পরিবারের লোক বলছে যে না, তার হাতে বইও ছিল। এখন গড নোজ, আসল ঘটনা কী, আমি তো জানি না। পরিবার আরও বলছে, ছেলেটা দরজা দিয়ে বের হয়েছে, জানালার কোনো গ্লাস ভাঙেনি। আমরা এখানেও বিস্তারিত জানতে পারিনি। তবে পুলিশ ঘটনাটি তদন্ত করছে, তদন্ত শেষে তারা ঠিক করবে কী হবে। আর আমেরিকায় আইন-কানুন খুব ভালো।
নিহত বাংলাদেশি সৈয়দ আরিফ ফয়সালের জন্ম বাংলাদেশের চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে। তার ফুপাতো ভাই মিজানুল আকবর চৌধুরী এই প্রতিবেদককে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের পুলিশের গুলিতে আমার ফুপাতো ভাই সৈয়দ আরিফ ফয়সাল হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে। এ বিষয়ে আমরা ক্ষতিপূরণ চাই। কিন্তু এখন পর্যন্ত দূতাবাস থেকে কোনো খোঁজখবর নেওয়া হয়নি। ওই খানের স্থানীয় কমিউনিটি এ হত্যার বিচার চেয়ে মানববন্ধনসহ নানা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। ওইখানের স্থানীয় মেয়র সম্বুল সিদ্দিকী, তিনিও বাংলাদেশি। সম্বুল সিদ্দিকী এ মুহূর্তে শহরের বাইরে রয়েছেন, তিনি সোমবার আসবেন, ওই দিন বিকালে কমিউনিটি সদস্যদের সঙ্গে মেয়র বৈঠক করে পরবর্তী করণীয় ঠিক করবেন।
নিহত আরিফের পরিবারের সঙ্গে দূতাবাস খোঁজখবর না নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন বলেন, দূতাবাস নিশ্চয়ই খবর নেবে। তাবাস হয়তো পুলিশ প্রতিবেদনের জন্য অপেক্ষা করছে। পুলিশ এ ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করবে এবং যে পুলিশ এ ঘটনা ঘটিয়েছে তাকে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানো হয়েছে, তাই ওই পুলিশ এ ঘটনার তদন্তে কোনো ইন্টারফেয়ার করতে পারবে না।
এ ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বাংলাদেশ কোনো ক্ষতিপূরণ চাইবে কি না, জানতে চাইলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, না, না, আমরা এ ধরনের চিন্তাভাবনা করছি না। ছেলেটার পরিবার চাইতে পারে, আমরা তো চাইতে পারি না। কারণ ছেলেটা আমেরিকার নাগরিক এবং আমেরিকান সরকার তাদের আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে। আমি জানি, আমেরিকার অভ্যন্তরীণ নিয়ম-কানুন খুব ভালো। তাই পুরিশের তদন্ত শেষে তার পরিবার ন্যায়বিচার পাবে বলে আশা রাখি।
এদিকে অভিযোগ আছে, বিদেশে যেসব বাংলাদেশি এমন হত্যাকাণ্ডের শিকার হয় তাদের পরিবারের খোঁজখবর নেয় না আমাদের দূতাবাসগুলো এবং আইনি কোনো সহযোগিতাও করে না। আর এসব পরিবারের সদস্য দূতাবাসের সহযোগিতা কীভাবে পাওয়া যায়, সে বিষয়েও ওয়াকিবহাল নয়। শুধু তাই নয়, এসব ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্য বিদেশ বলে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া চালাতেও ভয় পায়।
পূর্ব ইউরোপের প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র জর্জিয়ায় গত বছরের জুন মাসে হত্যার শিকার হন বাংলাদেশি প্রবাসী আবু সালেহ মাহফুজ। তিনি নোয়াখালী জেলার বাসিন্দা ছিলেন। তার ভাই মাহমুদ আহম্মেদ নোয়াখালী থেকে এ প্রতিবেদককে বলেন, আমার ভাই গত জুন মাসে জর্জিয়ায় হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। এ ঘটনায় বাংলাদেশ দূতাবাসের কেউই আমাদের খোঁজ নেয়নি, আর আমরাও জানি না যে দূতাবাসের সহযোগিতা কীভাবে পেতে হয়। এ ঘটনায় কোনো মামলা করেছিলেন কি না জানতে চাইলে মাহমুদ আহম্মেদ বলেন, না। জর্জিয়ার পুলিশ রাষ্ট্রপক্ষ হয়ে মামলা করেছিল। ওই খানে আমার ভাই তার পরিবার নিয়ে থাকত। তাই পরিবারের বাকি সদস্যদের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে আমরা নিজে থেকে কোনো মামলা করিনি।
বিদেশে বাংলাদেশিরা হত্যার শিকার হলে দূতাবাসগুলো কোনো খোঁজখবর নেয় না, এমন অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন এ প্রতিবেদককে বলেন, এমন ধরনের দুর্ঘটনা উত্তরোত্তর বাড়ছে। কিন্তু এরা সবাই আমেরিকান বা অন্য দেশের নাগরিক। তারা সবাই বাংলাদেশের অরিজিন; কিন্তু নাগরিকত্ব অন্য দেশের। এসব ঘটনায় সংশ্লিষ্ট দেশের আইনকানুন আছে, সেই দেশের আইনকানুন অনুযায়ী তাদের পরিবার ব্যবস্থা নেবে। এখানে আমাদের দূতাবাসের তেমন কিছু করার নেই। কিন্তু এমন ঘটনা যদি বাংলাদেশি নাগরিকের ক্ষেত্রে হয়, তাহলে আমরা কনস্যুলার সেবা দেব এবং তাদের সুবিধা-অসুবিধা আমরা দেখব।
এদিকে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড এবং বিমানবন্দরের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৮ থেকে ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত দেশের ৩ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ৪৫ হাজার ৩০১ জন প্রবাসীর মরদেহ এসেছে। এর মধ্যে ২৭ হাজার ২৩১ জনের মরদেহ এসেছে মধ্যপ্রাচ্যের ৬টি দেশ থেকে। শুধু সৌদি আরব থেকেই এসেছে ১২ হাজার ৯৩০ জন প্রবাসীর মরদেহ। বিদেশে মারা যাওয়া অনেক প্রবাসীর মরদেহ অনেক সময়ই দেশে আনা হয় না। স্থানীয়ভাবেই সেগুলো দাফন করা হয়, বিশেষ করে সৌদি আরবে। ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকায় প্রতিদিন গড়ে ৮ থেকে ১০টি লাশ আসে। অধিকাংশ লাশই আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। এদের অধিকাংশ মৃত্যুর কারণ ব্রেইন স্ট্রোক ও হার্ট অ্যাটাক। প্রকৃতপক্ষে, এসব মৃত্যুর কারণ নিয়ে মন্ত্রণালয় কখনো তদন্ত করে না।
ড. মো. নজরুল ইসলাম বর্তমানে বাহরাইনে নিযুক্ত বাংলাদেশে রাষ্ট্রদূত। এর আগে তিনি সৌদি আরবে বাংলাদেশের উপ-রাষ্ট্রদূত ছিলেন। ড. মো. নজরুল ইসলাম এ প্রতিবেদককে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশিদের মৃত্যু নিয়ে যে অভিযোগ আছে, তা সঠিক নয়। আমরা প্রতিটি মৃত্যুর ঘটনা যথাযথভাবে তদন্ত করি এবং এগুলোর সবকিছুই কেস টু কেস ফাইল সংরক্ষণ করা হয়। বাহরাইনে এখন প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার বাংলাদেশি রয়েছে। এদের মধ্যে গড়ে প্রতি মাসে ৪-৫ জনের মৃত্যু ঘটে এবং অস্বাভাবিক মৃত্যু হলে আমরা তদন্ত করে দেখি। নিহতের পরিবারকে দাফন-কাফনের জন্য ক্যাশ ৩৫ হাজার টাকা এবং ক্ষতিপূরণবাবদ ৩ লাখ টাকা দেওয়া হয়। এ দায়িত্ব পররাষ্ট্র ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় সমন্বয় করে পালন করে। আর অবৈধপথে বিদেশে এসে যারা মারা যায়, তাদের ক্ষেত্রে দূতাবাস সহযোগিতা করে এবং তাদের মরদেহ দেশে পাঠাতে উদ্যোগ নেয়।
