খুচরা টাকা না থাকার অজুহাতে ভেস্তে যাচ্ছে ই-টিকেটিং
মূলত ভাড়া নৈরাজ্য দূর করতে গণপরিবহনে ই-টিকেটিং পদ্ধতি চালু করে ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি। কিন্তু খুচরা টাকা না থাকাসহ নানা অজুহাতে বাড়তি ভাড়া আদায় চলছেই। ফলে বন্ধ হয়নি যাত্রী-কন্ডাক্টর বাকবিতণ্ডাও।
মূলত ভাড়া নৈরাজ্য দূর করতে গণপরিবহনে ই-টিকেটিং পদ্ধতি চালু করে ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি। কিন্তু খুচরা টাকা না থাকাসহ নানা অজুহাতে বাড়তি ভাড়া আদায় চলছেই। ফলে বন্ধ হয়নি যাত্রী-কন্ডাক্টর বাকবিতণ্ডাও। ই-টিকেটিংয়ে অনেক সড়কে ভাড়া কমলেও কোথাও কোথাও আবার বেড়ে গেছে। তাছাড়া টিকেটে নির্ধারিত দূরত্ব অনুযায়ী ভাড়া উল্লেখ না থাকাসহ নানা অভিযোগ রয়েছে যাত্রীদের। এসব অভিযোগের সমাধান না করেই দ্বিতীয় পর্বে ই-টিকেটিং চালু করতে যাচ্ছে সংগঠটি।
এ লক্ষ্যে সোমবার সংবাদ সম্মেলন ডেকেছে ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি। দুপুর ১২টায় সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্লাহ ২য় পর্বে ঢাকা মহানগরীতে ই-টিকেটিং চালুর ঘোষণা দেবেন। ১ম পর্বে গত ২২ সেপ্টেম্বর থেকে মিরপুর এলাকার চারটি কোম্পানির গণপরিবহনে ই-টিকেটিং চালু করা হয়। পরে পরিবহন মালিকদের সঙ্গে আলোচনা করে মোট ৩০টি কোম্পানির বাসে ভাড়া আদায়ের ডিজিটাল এ পদ্ধতি চালু করা হয়। নিয়ম অনুযায়ী যাত্রীরা যত কিলোমিটার যাবেন সরকার নির্ধারিত হারে ঠিক ততটুকু দূরত্বের ভাড়া দেবেন।
এদিকে, ১ম পর্বে চালু হওয়া বিভিন্ন কোম্পানির বাসে এখনও ই-টিকেটিং পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি। অনেক বাসে খুচরা টাকা না থাকার অজুহাতে টিকেট না দিয়েই ভাড়া নিচ্ছে। শুরুতে বাস স্টপেজগুলোতে কাউন্টার বসালেও দাবির প্রেক্ষিতে পজ মেশিন (ই-টিকেটের মেশিন) দিয়ে দেওয়া হয় হেল্পারদের হাতে। এতে করে অনেক পরিবহনে হেল্পাররা গলায় পজ মেশিন ঝুলিয়ে টিকেট না দিয়েই ভাড়া নিচ্ছেন।
রাজধানীর বিভিন্ন গন্তব্য থেকে মিরপুর চলাচলকারী শেকড়, শিখর, আয়াত, বিকল্প, বিহঙ্গ, অছিম, আসমানী, মিরপুর লিংকসহ বেশ কয়েকটি গণপরিবহনে এমন চিত্র দেখা গেছে। যাত্রীদের অভিযোগ, ই-টিকেটিং ব্যবস্থায়ও কৌশলে পকেট কাটা হচ্ছে তাদের। অনেক বাসের টিকেটেই গন্তব্যস্থল ও দূরত্ব উল্লেখ না করে শুধু ভাড়ার পরিমাণ লেখা থাকছে। কিন্তু কত কিলোমিটার দূরত্বের জন্য এই ভাড়া নেওয়া হলো তা উল্লেখ থাকছে না। তা ছাড়া অনেক বাসে ভাড়ার টাকা দিলেই কন্ডাক্টররা নিয়ে নিচ্ছে, কিন্তু কোনো টিকেট দিচ্ছে না। কেউ টিকেট দিতে বললে তার কাছে বাড়তি ভাড়া দাবি করা হচ্ছে।
অছিম পরিবহনে করে রাজধানীর নতুন বাজার থেকে ডেমরা যান মনিরুল ইসলাম। তার কাছ থেকে ৩০ টাকা ভাড়া নেন কন্ডাক্টর। এ সময় টিকেট চাইলে কন্ডাক্টর ৩৫ টাকা দিতে বলেন। কন্ডাক্টর শাহাবুদ্দিনের যুক্তি বসুন্ধরা গেট থেকে ডেমরা পর্যন্ত ৩৫ টাকা ভাড়া। টিকেট নিতে হলে ৩৫ টাকাই দিতে হবে। বাকবিতণ্ডার এক পর্যায়ে মনিরুল বলেন, আমি তো নতুন বাজার থেকে উঠেছি। আমাকে যমুনা ফিউচার পার্কের টিকেট দিলেন কেন?
একই পরিবহনে মেরাদিয়া থেকে স্টাফ কোয়ার্টার যান আমিনুল ইসলাম। তিনি বলেন, যেখানে আগে ২০ থেকে ২৫ টাকা নিত এখন ই-টিকেটিংয়ে ১৫ টাকা নিচ্ছে। তবে টিকেট না চাইলে কাউকে দিচ্ছে না। আগের মতোই ইচ্ছেমতো ভাড়া নিচ্ছে। আমি টিকেট চেয়েছি বলে পেয়েছি। আমার পাশের অনেক যাত্রীর কাছ থেকেই আগের নিয়মে ভাড়া নিতে দেখেছি।
কন্ডাক্টরের গলায় পজ মেশিন থাকলেও সেটি ব্যবহারে অনীহা তাদের। খুব সময়ই এটি ব্যবহার করা হচ্ছে। কন্ডাক্টরদের দাবি, খুচরা ভাড়ায় সাধারণত টিকেট কাটা হচ্ছে না। আর যাত্রীর চাপ বেশি থাকলে মেশিনে টিকেট কাটা সম্ভব হয় না। তখন হাতে ভাড়া আদায় ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না।
শেকড় পরিবহনের এক যাত্রী বলেন, আগে মিরপুর ১০ নম্বর থেকে কারওয়ান বাজারের ভাড়া ছিল ১৫ টাকা। কিন্তু এখন নিচ্ছে ১৮ টাকা। মিরপুর ১০ থেকে শাহবাগ পর্যন্ত ছিল ২০ টাকা। কিন্তু এখন নেয় ২৩ টাকা।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী সময়ের আলোকে বলেন, ই-টিকেটিং নিয়ে আমরাও অনেক অভিযোগ পেয়েছি। বিশেষ করে বাড়তি ভাড়া আদায় এবং নির্দিষ্ট দূরত্ব উল্লেখ না থাকা।
তিনি বলেন, ই-টিকেটিং ব্যবস্থা ভাড়া নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে ভালো একটি পদ্ধতি। কিন্তু এটিকে সুষ্ঠুভাবে ব্যবস্থাপনার আওতায় আনতে হবে। মনিটরিং ব্যবস্থা আরও জোরদার করতে হবে। টিকেটের গায়ে গন্তব্যের দূরত্ব উল্লেখ থাকতে হবে। তা না হলে ই-টিকেটিংয়ের সুফলও যাত্রীরা পাবে না।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার এনায়েত উল্লাহ বলেন, আমরা সব বাসে ই-টিকেটের মাধ্যমে ভাড়া আদায় ব্যবস্থা চালু করতে পারিনি। টিকেটে কিলোমিটার, দূরত্ব উল্লেখ না করাসহ যাত্রীদের অন্যান্য অভিযোগ নিরসনে আমরা কাজ করছি।
তিনি বলেন, ই-টিকেটে ভাড়া আদায়ে অনীহা কিছু জায়গায় দেখা যাচ্ছে। আরও কিছু জায়গায় অনিয়ম আছে, সেগুলো খতিয়ে দেখছি। এসব বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত জানানো হবে।
