07:33:34 pm
Sunday, June 21

বেড়েছে দগ্ধ রোগীর চাপ, শয্যার জন্য হাহাকার

পনেরো মাসের ছোট্ট শিশু রোজমণি। গোসলের জন্য রাখা গরম পানিতে তার গলার নিচে ও ডান হাত দগ্ধ হয়েছে। শিশুর বাবা আবদুর রহিম জানান, রোববার সকাল ১০টার দিকে বাচ্চার মা গোসল করার জন্য পাতিলে গরম পানি করে রান্নাঘরে রাখে।

পনেরো মাসের ছোট্ট শিশু রোজমণি। গোসলের জন্য রাখা গরম পানিতে তার গলার নিচে ও ডান হাত দগ্ধ হয়েছে। শিশুর বাবা আবদুর রহিম জানান, রোববার সকাল ১০টার দিকে বাচ্চার মা গোসল করার জন্য পাতিলে গরম পানি করে রান্নাঘরে রাখে। সেখানে খেলতে গিয়ে গরম পানি পড়ে বাচ্চার শরীর পুড়ে গেছে। বেলা ১১টার দিকে নিয়ে আসা হয় রাজধানীর শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিউটের বহির্বিভাগে। 

এ সময় পোড়া শরীরের যন্ত্রণায় ছটফট করছে শিশুটি। পাশে দাঁড়ানো শিশুর মা হোসনে আরাসহ স্বজনদেরও অঝোরে কান্না করতে দেখা যায়। তাদের কান্না ও চিৎকারে ভারী হয়ে উঠে হাসপাতাল চত্বর। সৃষ্টি হয় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের। জরুরি বিভাগে প্রায় ১ ঘণ্টা প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে কিছু ওষুধপত্র লিখে শিশুটি পাঠিয়ে দেওয়া তাদের কেরানীগঞ্জের বাসায়। এ সময় শিশুটির বাবা বলেন, মেয়েটি পোড়া শরীরের যন্ত্রণায় ছটফট করছে। অথচ ভর্তি নিল না। এই অবস্থায় আমি মেয়েটিকে নিয়ে কীভাবে বাসায় থাকব। হাসাপাতালের চিকিৎসা কি বাসায় পাব? 

একই সময়ে বহির্বিভাগে নিয়ে আসা হয় আগুন পোহাতে গিয়ে দগ্ধ হওয়া কিশোরগঞ্জের রাসেল মিয়াকে (১৩)। তার মুখ ও গলার ১৫ শতাংশ পুড়ে গেছে। তাকেও প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে ভর্তি না করে অন্য হাসপাতালে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। বহির্বিভাগে ২ ঘণ্টায় ৭ জন রোগী এলেও তাদের কাউকে ভর্তি করা হয়নি। তাদের কেউ এসেছেন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে, আগুন পোহাতে গিয়ে কিংবা রান্নার চুলার আগুনে এবং গরম পানিতে ঝলসে গিয়ে।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ৫০০ শয্যার এই হাসপাতালটিতে কোনো শয্যা নেই। শয্যা খালি হলেই নতুন কাউকে ভর্তি করা হয়। আর শীতের এই সময়ে প্রায় ৩০ শতাংশ রোগী বেড়েছে। যাদের বেশির ভাগই শিশু। ফলে শয্যা সংকটের কারণে বাধ্য হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কিংবা অন্য হাসপাতালে রোগীদের পাঠানো হচ্ছে।

শেখ হাসিনা বার্ন ইনস্টিটিউটের জরুরি বিভাগের রেজিস্টারের হিসাব অনুযায়ী গত ৮ দিনে হাসপাতালের বহির্বিভাগ থেকে সেবা নিয়েছে ১৮০০ রোগী। গত নভেম্বরে বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছে ৬ হাজার ৩৬৪ জন, নভেম্বরে-ডিসেম্বরে ৬ হাজার ৯৮ জন। এর মধ্যে শনিবার রাত ১২টা থেকে রোববার বেলা ১টা পর্যন্ত সেবা নিয়েছে ২৪৩ জন। যেখানে গড়ে ২২৫ জন রোগী সেবা নিয়েছে। আর জরুরি বিভাগে রোগী বেড়ে প্রতিদিন গড়ে ৭০ জন রোগী আসছে। সাধারণ সময়ে যেটি ছিল ৪০-৫০ জন। এ ছাড়া রোববার শয্যা ফাঁকা না থাকায় নতুন কাউকে ভর্তি করা হয়নি। এর আগের দিন শনিবার ১৪ জনকে ভর্তি করা হয়।

চিকিৎসকরা বলছেন, শীতে গরম পানির ব্যবহার বাড়ে। ফলে গরম পানিতে ঝলসে যাওয়া রোগীর সংখ্যাও বাড়ে। তাই অভিভাবকরা সচেতন হলে এমন দুর্ঘটনা অর্ধেকে নামিয়ে আনা সম্ভব। আর এ জন্য শীতে আগুন পোহানো কিংবা গরম পানির ব্যবহার নিয়ে সাবধানতা অবলম্বনের ওপর জোর দিতে বলেছে তারা।

রোববার সরেজমিনে দেখা গেছে, বার্ন ইনস্টিটিউটে রোগীদের রোগীদের উপচে পড়া ভিড় দেখা গেছে। তাদের কারও এক হাতে কিংবা দুই হাতে ব্যান্ডেজ, কারও পায়ে, আবার কারও মাথায় কিংবা সারা শরীরে ব্যান্ডেজ করা। হাসপাতালে জরুরি বিভাগ থেকে শুরু করে বহির্বিভাগ, ড্রেসিং রুম, মেডিসিন বিভাগ এবং টাকা জমা দিতে আসা ব্যাংকের বুথের সামনেও রোগীও স্বজনদের ভিড় দেখা গেছে। রোগীদের অনেকের অবস্থা খারাপ হওয়ায় তারা বিভিন্ন ওয়ার্ডে কাতরাচ্ছে। এ ছাড়াও স্বজনদেরকেও ছোটাছুটি করতে দেখা গেছে।

হাসপাতালে ভর্তি একাধিক রোগীর স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শীতে আগুন পোহাতে গিয়ে গরম পানি পড়ে, রান্নার সময় চুলার আগুনে, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে কিংবা গ্যাস সিলিন্ডার লিকেজ থেকে লাগা আগুনে দগ্ধ হয়েছে বেশি। স্থানীয় হাসপাতালগুলোতে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়েই এসব রোগীদের পাঠানো হচ্ছে শেখ হাসিনা বার্ন ইনস্টিটিউটে।

ইনস্টিটিউটের ড্রেসিং রুমের সামনে দাঁড়িয়ে আছে পাঁচ বছরের জুবায়ের। তার গরম পানির হাঁড়ির ওপর পড়ে গিয়ে বাম হাত কনুইয়ের ওপর পর্যন্ত ঝলসে গেছে। চোখ থেকে গড়িয়ে পড়া পানি মুছে দিচ্ছেন তার মা নাসিমা বেগম। তাদের বাসা মিরপুরে। তিনি বলেন, শীতের কারণে পানি গরম করে রান্নাঘরে রেখেছিলাম। ছেলেটা খেলতে গিয়ে পড়েছে গরম পানির হাঁড়ির ওপর। এরপর হাসপাতালে নিয়ে আসি। 

তিনি বলেন, ছেলেটা সারা রাত ঘুমাতে পারে নাই, যন্ত্রণায় ছটফট করেছে। ছেলের এই যন্ত্রণা দেখার চেয়ে মরে যাওয়াও অনেক ভালো ছিল।

কুমিল্লা থেকে এই হাসপাতালে ভর্তি হওয়া এক রোগীর চাচা আবদুর রাজ্জাক বলেন, আমার ভাতিজা শীতের সকালে খড়ের আগুন পোহাতে গিয়ে দগ্ধ হয়েছে। তার শরীরের ৩৫ শতাংশ পুড়ে গেছে। চার দিন ধরে এখানে ভর্তি। কোনো উন্নতি হচ্ছে না। বাঁচা-মরা আল্লাহর ওপর ছেড়ে দিয়েছে।

বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে দগ্ধ হওয়া এক সাইফুল ইসলাম নামের এক রোগী বলেন, শুক্রবার হাজারীবাগের কারখানায় কাজ করতে গিয়ে দুই হাত জ¦লে গেছে। পাশে থাকা কয়েকজন মিস্ত্রি তার চিৎকার শুনে তাকে উদ্ধার করে পরে নিয়ে আসে। উদ্ধার করতে আর কয়েক সেকেন্ড দেরি হলেই তাকে বাঁচানো যেত না বলেও মনে করেন তিনি।

শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের আবাসিক সার্জন ডা. এস এম আইউব হোসেন সময়ের আলোকে বলেন, বর্তমানে শয্যা ফাঁকা না থাকায় আমরা কোনো রোগী ভর্তি নিতে পারছি না। শয্যা ফাঁকা হলেই কেবল নতুন রোগী ভর্তি নেওয়া হবে। 

শেখ হাসিনা বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের প্রধান সমন্বয়ক ডা. সামন্ত লাল সেন সময়ের আলোকে বলেন, প্রতি বছরের তুলনায় এবার রোগীর চাপ অনেক বেশি। প্রচণ্ড শীতে আগুন পোহাতে গিয়ে অনেকে দগ্ধ হচ্ছে। অনেকেই চুলা জ্বালিয়ে ঘর গরম রাখা বা কাপড় শুকাতে গিয়ে দুর্ঘটনায় পড়ছে। রোগী বেশি হওয়ার কারণে অনেককে প্রাথমিক সেবা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। আর এই বিষয় সম্পর্কে আলোচনা করতে এখন মন্ত্রণালয়ে যাচ্ছি। 

তিনি বলেন, পোড়া রোগীর সবচেয়ে ভালো প্রতিরোধ হলো সচেতনতা বৃদ্ধি করা। সবাই যদি রান্না করার সময়, অফিস-আদালতে কিংবা বৈদ্যুতিক কাজের সময় নিরাপত্তাজনিত উপকরণ ব্যবহার করে তাহলে দেশ থেকে অনেকাংশেই পোড়া রোগীর সংখ্যা কমে যাবে। অভিভাবকরা সচেতন হলে এমন দুর্ঘটনা অর্ধেকে নামিয়ে আনা সম্ভব বলে মনে করেন এই চিকিৎসক।