বাজেটে ব্যাংকের করপোরেট কর কমছে আড়াই শতাংশ
ব্যাংক খাতের করপোরেট করহার কমছে আড়াই শতাংশ। কাল বৃহস্পতিবার অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত সংসদে বাজেট পেশের সময় এ সুখবর দেবেন। একই সঙ্গে প্রস্তাবিত ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেটের আকার চূড়ান্ত করা হয়েছে।
এটা হবে চার লাখ ৬৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। বাজেট প্রণয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত ঘনিষ্ঠ সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
সূত্রমতে, শুধু ব্যাংক খাতের করপোরেট করহার কমিয়ে সাড়ে ৩৭ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব করা হচ্ছে। বর্তমানে ব্যাংক খাতের করপোরেট করহার ৪০ শতাংশ। করপোরেট করের মধ্যে ব্যাংক খাত থেকে সবচেয়ে বড় এবং বেশি কর আহরণ হয়।
এ করহার কমানোর জন্য দীর্ঘ সময় ধরে দাবি জানিয়ে আসছেন ব্যাংকারসহ শীর্ষ উদ্যোক্তারা। সর্বশেষ ব্যাংক খাতের করহার কমানো হয়েছিল পাঁচ বছর আগে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র বলেছে, মূলত বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ চাঙ্গা করতে ব্যাংক খাতের উল্লিখিত করহার কমানোর প্রস্তাব করা হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, ব্যাংক খাতের করপোরেট করহার কমলে একদিকে কর কাঠামোর বিরাজমান বৈষম্য নিরসন হবে, পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। অন্যদিকে, ব্যাংকাররা বলেছেন, করহার কমানো হলে ব্যাংকগুলোর মুনাফা বাড়বে। এতে মূলধন (ক্যাপিটাল) বাড়বে। এর প্রভাবে সামগ্রিকভাবে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে।
এনবিআর সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে আয়ের প্রকৃতিভেদে ব্যাংক খাতসহ কোম্পানি বা করপোরেট করের ছয়টি স্তর রয়েছে। করপোরেট করের সর্বোচ্চ হার ৪৫ এবং সর্বনিম্ন ২৫ শতাংশ। একক খাত হিসেবে ব্যাংক থেকে সবচেয়ে বেশি করপোরেট কর আদায় হয়।
ব্যাংকগুলো বছরে যে পরিমাণ মুনাফা করে তা থেকে উল্লিখিত হারে কর আদায় করে সরকার। জানা যায়, করপোরেট কর থেকে ১০০ টাকা আদায় হলে ৬৫ টাকা আসে ব্যাংক খাত থেকে। অবশিষ্ট ৩৫ টাকা অন্যসব কোম্পানি থেকে। বর্তমানে এনবিআরের অধীনে ৬০টি ব্যাংক নিবন্ধিত। গত ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এসব ব্যাংক থেকে আদায় হয় সাত হাজার ৩০৪ কোটি টাকা।
ব্যাংক ছাড়া অন্য যেসব খাত থেকে করপোরেট কর আদায় করা হয় সেগুলো হলো- মোবাইল এবং সিগারেট কোম্পানি ৪৫ শতাংশ, লিজিং ও মার্চেন্ট ব্যাংক ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান সাড়ে ৩৭ শতাংশ, শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত নয়- এমন কোম্পানি ৩৫ শতাংশ এবং শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির জন্য ২৫ শতাংশ হারে করহার নির্ধারিত আছে।
সূত্র জানায়, প্রস্তাবিত ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেটে শুধু ব্যাংক খাতের করপোরেট হার কমানোর প্রস্তাব করা হচ্ছে। বাকি অন্যসব খাতের করহার আগের মতো অপরিবর্তিত থাকছে।
যোগাযোগ করা হলে অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান ও বেসরকারি মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আনিস এ খান সমকালকে বলেন, ব্যাংক খাতে করপোরেট করহার অনেক বেশি। এই করহার কমালে ব্যাংকের মুনাফা আরও বাড়বে। এর ফলে মূলধনও বৃদ্ধি পাবে। উপকৃত হবেন উদ্যোক্তা ও শেয়ারহোল্ডাররা। সামগ্রিকভাবে দেশের বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পিআরআই ও আইএমএফের সাবেক কর্মকর্তা ড. আহসান এইচ মনসুর সমকালকে বলেন, বর্তমানে করপোরেট কর কাঠামোতে বৈষম্য রয়েছে। স্থানীয় বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বাণিজ্য প্রসার ঘটাতে হলে ন্যায়সঙ্গত করকাঠামো দরকার।
এ জন্য করপোরেট করহার যৌক্তিকীকরণ করতে হবে। তিনি মনে করেন, ব্যাংক খাতের করপোরেট করহার কমানো হলে বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিত হবে। তবে এ ক্ষেত্রে কিছু শর্ত দেওয়ার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, কর কমানোর ফলে বাড়তি মুনাফা দিয়ে ব্যাংকগুলোর মূলধনি ঘাটতি পূরণ করতে হবে।
এনবিআরের সাবেক সদস্য আমিনুর রহমান বলেন, প্রস্তাবিত করহার কার্যকর হলে ব্যাংকের ওপর চাপ কমবে। বাড়তি মুনাফার ফলে বাজারে ঋণের জোগান বাড়বে। ফলে উদ্যোক্তাদের বেশি করে ঋণ দিতে পারবে ব্যাংকগুলো।
প্রতিবেশী ভারতসহ অনেক দেশে করপোরেট করহার বাংলাদেশের তুলনায় কম। এসব দেশে করপোরেট কর-কাঠামো সহজ করা হয়েছে। ভারতে দুই স্তরে এই কর আদায় হয়। স্থানীয় কোম্পানির জন্য ৩০ শতাংশ এবং বিদেশি কোম্পানির জন্য ৩৫ শতাংশ।
সিঙ্গাপুরে একটি মাত্র হার, ১৩ শতাংশ। শ্রীলংকা ও পাকিস্তানে এই হার যথাক্রমে ১৫ ও ৩২ শতাংশ। এ ছাড়া এই হার উন্নত দেশের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে ৩৯, ফ্রান্সে ৩৩, অস্ট্রেলিয়ায় ৩০ ও চীনে ২৫ শতাংশ।
বিভিন্ন দেশে ব্যক্তি করদাতার জন্য যে করহার নির্ধারণ করা হয়, তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে করপোরেট কর আদায় হয়। বাংলাদেশে ব্যক্তিশ্রেণি করদাতার কাছ থেকে তুলনামূলক আদায় কম হয়।
তবে এটা ঠিক, অন্যান্য দেশের তুলনায় এখনও বাংলাদেশে উচ্চহারে করপোরেট কর আরোপিত রয়েছে। ইতিবাচক দিক হচ্ছে, প্রতিবছর বাজেটে করপোরেট করহার ক্রমান্বয়ে কমানো হচ্ছে।
আগামী বাজেটের আকার :
২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেটের সম্ভাব্য আকার চূড়ান্ত হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, পাঁচ শতাংশ ঘাটতি ধরে এবারের বাজেটের আকার ধরা হয় চার লাখ ৬৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
প্রস্তাবিত বাজেটে মোট রাজস্ব প্রাপ্তি ধরা হয় তিন লাখ ৩৯ হাজার ২০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে এনবিআর থেকে আসবে দুই লাখ ৯৬ হাজার ২০১ কোটি টাকা।

Join the conversation