কুকিদের পোশাকে জঙ্গিদের প্রশিক্ষণ
বিচ্ছিন্নতাবাদী পাহাড়ি সংগঠন ‘কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের’ (কেএনএফ) আস্তানায় ঠাঁই নেওয়া জঙ্গিরা আত্মগোপনে থেকে এখনও বিভিন্ন রকম প্রশিক্ষণ অব্যাহত রেখেছে বলে জানা গেছে।
বিচ্ছিন্নতাবাদী পাহাড়ি সংগঠন ‘কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের’ (কেএনএফ) আস্তানায় ঠাঁই নেওয়া জঙ্গিরা আত্মগোপনে থেকে এখনও বিভিন্ন রকম প্রশিক্ষণ অব্যাহত রেখেছে বলে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্টদের তথ্য মতে, ‘জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়া’র এই জঙ্গিরা কেএনএফ তথা কুকিদের ‘কম্ব্যাট’ পোশাক পরে সামরিক প্রশিক্ষণ নিয়েছে। তবে চলমান অভিযানের এ পর্যায়ে এসব জঙ্গিরা পূর্বের আস্তানা থেকে স্থানান্তরিত হয়ে বিকল্প স্থানে আত্মগোপন করে আছে বলে জানা যায়। তার মধ্যে গত রোববার রাতে অভিযান চালিয়ে হিন্দাল শারক্বীয়ার প্রধান অস্ত্র সরবরাহকারীসহ তিনজনকে গ্রেফতারের কথা জানিয়েছে ডিএমপির কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্স ন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট। এ ছাড়াও বান্দরবানের ওই অভিযানভুক্ত এলাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় হিন্দাল শারক্বীয়ার আরও বেশ কয়েকজনকে নজরদারিতেও রেখেছে এলিট ফোর্স র্যাব।
এ প্রসঙ্গে র্যাবের মুখপাত্র কমান্ডার খন্দকার আল মঈন সময়ের আলোকে বলেন, সাধারণ পাহাড়ি বাসিন্দাদের জানমালের ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে সরাসরি গুলিবর্ষণ না করে কৌশলগত পদ্ধতিতে জঙ্গিদের পাহাড় থেকে বের করার চেষ্টা চলছে। হিন্দাল শারক্বিয়ার শীর্ষ পর্যায়ের নেতাসহ কিছু জঙ্গিকে গ্রেফতার এবং কিছু সদস্যকে স্বাভাবিক জীবনে ফেরানোর এ দুটি পদ্ধতিতেই কাজ চালিয়ে যাচ্ছে র্যাব।
অন্যদিকে গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারা বলেছেন, প্রশিক্ষণকে গুরুত্ব দিতে এবং নিজেকে সামরিক যোদ্ধা অনুধাবণের লক্ষ্যেই জঙ্গি সংগঠনটি কুকিদের সামরিক পোশাক ব্যবহার করে। বিশেষ করে শারীরিক কসরত ও অস্ত্র প্রশিক্ষণকালে কেএনএফের সামরিক শাখার পোশাক ব্যবহার করে। যেটি অনেকটা সেনাবাহিনীর পোশাকের মতো। এ ছাড়া কখনো কখনো ধূসর-সবুজসহ নানা রঙের ইউনিফরম বা কম্ব্যাট পোশাক পরেও তারা প্রশিক্ষণ নেয় বলে জানা গেছে। বিগত প্রায় তিন মাস ধরে পার্বত্য বান্দরবানের দুর্গম এলাকায় কেএনএফ এবং হিন্দাল শারক্বিয়ার জঙ্গিদের বিরুদ্ধে অভিযানে অংশ নেওয়া কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য জানা গেছে।
গোয়েন্দা কর্মকর্তারা সময়ের আলোকে জানান, বান্দরবানের গহীন এলাকায় এখনও হিন্দাল শারক্বিয়ার অন্তত অর্ধশত জঙ্গি আত্মগোপনে আছে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ কেএনএফের আস্তানা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছে। একসঙ্গে থাকা বা চলা বিপজ্জনক মনে করে তারা পরিকল্পিতভাবে গ্রুপ-উপগ্রুপে বিভক্ত হয়েছে।
কর্মকর্তারা আরও বলেছেন, ইতিমধ্যেই হিন্দাল শারক্বিয়ার বেশ কিছু জঙ্গি সামরিক আদলে প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেছে। প্রশিক্ষণকালে তারা কুকিদের ব্যবহৃত সামরিক পোশাক ব্যবহার করে। হিন্দাল শারক্বিয়ার জঙ্গিদের প্রশিক্ষণের এমন একটি ভিডিও বা ছবি গোয়েন্দা সংস্থার হাতে রয়েছে বলেও গোপন সূত্রে জানা গেছে।
অভিযানে থাকা একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জঙ্গিবাদে জড়িয়ে নিরুদ্দেশ হওয়া বা কথিত হিজরতে যাওয়ার পর ইতিমধ্যেই বেশ কিছু জঙ্গি গ্রেফতার হয়েছে। একাধিক নারীসহ আরও কয়েকজন আত্মোপলব্ধি থেকে জঙ্গিবাদ ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনের ফিরে এসেছে। তারপরও এখনও অন্তত অর্ধশত বা তার কিছু বেশি সংখ্যক জঙ্গি হিন্দাল শারক্বিয়ার ব্যানারে পার্বত্য বান্দরবানের রুমাসহ আশপাশে আত্মগোপনে আছে। এসব এলাকায় গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে পর্যাপ্ত নজরদারি ও অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে র্যাবের নেতৃত্বে একাধিক বাহিনীর সদস্যরা।
কর্মকর্তা বলছেন, অঞ্চলটি ব্যাপক দুর্গম এবং উঁচু-নিচু ভূমির কারণে চারদিক থেকে ঘেরাও করে অভিযান চালানোর অবস্থা নেই। যেটা সমতল ভূমি হলে সম্ভব ছিল। তা ছাড়া দুর্গম এলাকাটির সঙ্গে ‘অরক্ষিত’ অন্য দেশের সীমান্ত রয়েছে। ফলে দেশের বাইরের সীমানায় চলে যেতে পারে। এ সবদিক মাথায় রেখে অভিযান কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।
র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন সময়ের আলোকে বলেন, পাহাড়ে হিন্দাল শারক্বিয়ার আত্মগোপনে থাকা জঙ্গিদের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান চলমান রয়েছে। এলাকাটির প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে ‘গুলি’ ছাড়াও আরও মাধ্যম ব্যবহার করে পাহাড়ে থাকা জঙ্গিদের হেফাজতে নেওয়ার চেষ্টা চলছে। যার মধ্যে রয়েছে গ্রেফতার করে আইনের আওতায় নেওয়া এবং স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা।
তিনি জানান, র্যাবের গোয়েন্দা শাখা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাটালিয়নের সদস্যরা দিনরাত সেখানে নজরদারি ও অভিযান চালিয়ে যাচ্ছেন। শিগগিরই এ বিষয়ে আরও কিছু অগ্রগতি জনগণকে জানানো হবে বলেও জানান তিনি।
জানা যায়, ঢাকা, সিলেট ও কুমিল্লাসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে অর্ধশতাধিক তরুণ আকস্মিকভাবে বাড়ি ছেড়ে নিরুদ্দেশ বা কথিত হিজরত করলে বিষয়টি ব্যাপক আলোচিত হয়। সব গোয়েন্দা সংস্থা এটি নিয়ে কাজ শুরু করলে এক পর্যায়ে র্যাবের মাধ্যমে প্রকাশ্য হয় যে, নিরুদ্দেশ তরুণরা সবাই হিন্দাল শারক্বিয়া নামক ওই নতুন জঙ্গি প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হয়েছে। জেএমবি, এবিটি ও আনসাল আল ইসলামসহ একাধিক জঙ্গি সংগঠনের বিচ্ছিন্ন নেতারা একত্রিত হয়ে ওই হিন্দাল শারক্বিয়া গঠন করে। কিন্তু আরও ভয়ংকর তথ্য প্রকাশ হয় যখন, বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন ‘কেএনএফ’র ঘাঁটিতে তাদের মাধ্যমে এই জঙ্গিরা সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করছে বলে খবর জানা যায়। কেএনএফ প্রধান নাথান বমের সঙ্গে আর্থিক চুক্তির মাধ্যমে এই প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চলছিল। পরবর্তী সময়ে র্যাব ও নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযান শুরু হলে আস্তানা ভেঙে যাওয়াসহ বিচ্ছিন্ন হয়ে আত্মগোপনে চলে যায় কেএনএফ ও হিন্দাল শারক্বিয়ার সদস্যরা।
তবে অভিযানের শুরুর দিকে গত ২০ অক্টোবর বান্দরবান ও রাঙ্গামাটির বিভিন্ন অঞ্চল থেকে হিন্দাল শারক্বিয়ার সাতজন এবং পাহাড়ি বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন ‘কেএনএফ’র তিনজনসহ মোট ১০ জনকে গ্রেফতার করে র্যাব। এ সময় তাদের কাছ থেকে অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়। এরপরে গত ৮ নভেম্বর এ জঙ্গি সংগঠনের অর্থ সরবরাহকারীসহ তিনজনকে গ্রেফতার করেছিল র্যাব। গত ৪ ডিসেম্বর র্যাবের অভিযানে হিন্দাল শারক্বিয়ার পাঁচ জঙ্গি গ্রেফতার হয়। এর বাইরে গত ২১ ডিসেম্বর ডিএমপির সিটিটিসি ইউনিটও হিন্দাল শারক্বিয়ার দুজনকে গ্রেফতার করে।
সর্বশেষ গত ৮ জানুয়ারি রাতে হিন্দাল শারক্বিয়াকে ‘অস্ত্র সরবরাহকারী’ তিনজনকে গ্রেফতার করেছে সিটিটিসি। তাদের মধ্যে- মো. কবীর আহাম্মদ (৫০) নামের একজনকে রোববার রাতে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি থেকে এবং মো. ইয়াসিন (৪০) ও আবদুর রহমান ইমরান (২৬) নামের দুজনকে রাজধানীর কদমতলী থেকে গ্রেফতার করা হয়। এসব অভিযানের মাঝে জঙ্গিবাদ ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনেও ফিরেছে একাধিক নারীসহ কয়েকজন।
ডিএমপির সিটিটিসি প্রধান আসাদুজ্জামান বলেন, গ্রেফতারকৃত কবীরের সঙ্গে যোগাযোগ করে হিন্দাল শারক্বিয়ার মাস্টার মাইন্ড পলাতক শামিন মাহফুজ দুর্গম পার্বত্য এলাকায় সশস্ত্র প্রশিক্ষণের জন্য বিভিন্ন ধাপে অস্ত্র সংগ্রহ করতেন।
