পুরো সেট পাঠ্যবই শিক্ষার্থীরা হাতে পাবে কবে?
নতুন বছরের এক সপ্তাহ পেরোলেও এখনও সব পাঠ্যবই পৌঁছায়নি প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের বেশিরভাগ শিক্ষার্থীর হাতে। বছরের প্রথম দিন ঘটা করে বই উৎসব হলেও এবার শিক্ষার্থীদের পুরো সেট বই হাতে তুলে দিতে পারেনি। কাগজ ও কালির সংকট, ঊর্ধ্বমুখী দাম, ছাপা সরঞ্জামের মূল্যবৃদ্ধি, লোডশেডিং, দুটি শ্রেণিতে নতুন শিক্ষাক্রম ও এনসিটিবির কার্যাদেশে দেরি ইত্যাদি কারণে বিনামূল্যের পাঠ্যবই নিয়ে এমনটা হয়েছে।
শিক্ষার্থী-অভিভাবকরা বলছেন, সময়মতো বই না পাওয়ায় পড়ালেখার ক্ষতি আরও বাড়বে। পাঠ্যপুস্তক নিয়ে আরও দায়িত্বশীল হওয়া উচিত ছিল। এক সপ্তাহের মধ্যে অবশিষ্ট বই স্কুলে যাবে বলে আশাবাদ জানিয়েছে বই বিতরণের দায়িত্বে থাকা জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)।
রাজধানী ঢাকা ও বিভিন্ন এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সূত্রে জানা গেছে, স্কুলে ধাপে ধাপে বই দেওয়া হচ্ছে, বাকি বই এলে শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছে দেওয়া হবে। সোমবার খোদ রাজধানীর বিভিন্ন স্কুল ঘুরে দেখা যায়, এক সপ্তাহ পরও অধিকাংশ শিক্ষার্থী ৪ থেকে ৫টির বেশি বই পায়নি। কোনো বই পায়নি, এমন শিক্ষার্থীরও খোঁজ মিলেছে। ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে এসব বিষয়ের ক্লাস নেওয়া যায়নি। মাতৃছায়া কিন্ডারগার্টেন স্কুলে প্রাক-প্রাথমিকের শুধু শিক্ষা উপকরণ দেওয়া হয়েছে। আবার সেন্ট টমাস মিশনারি স্কুলে প্রাক-প্রাথমিকের পাঠ্যবই দেওয়া হয়েছে। স্কুল দুটিতে প্রথম শ্রেণিতে বাংলা, দ্বিতীয় শ্রেণিতে বাংলা, গণিত, তৃতীয় শ্রেণিতে বাংলা, চতুর্থ শ্রেণিতে বাংলা, বাংলাদেশ ও বিশ্ব পরিচয়, ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষা বিষয়ের বই শিক্ষার্থীদের দেওয়া হয়েছে। পঞ্চম শ্রেণির কোনো পাঠ্যবই এখনও পাওয়া যায়নি।
ঢাকার পাশর্বর্তী কয়েকটি উপজেলার প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার জানান, প্রতিদিনই পাঠ্যবই আসছে। এরপর উপজেলার স্কুলগুলোতে সেসব বই পাঠানো হচ্ছে। প্রাথমিকের কোনো শ্রেণিতেই পুরো সেট পাঠ্যবই এখনও তারা পায়নি বলে জানায়।
মাতৃছায়া কিন্ডাগার্টেন স্কুলের প্রধান শিক্ষক রমজান হোসেন বলেন, পঞ্চম শ্রেণির একটি বইও স্কুলে আসেনি। প্রতিটি শ্রেণির একটি কিংবা দুটি বই পাওয়া গেছে। প্রতিদিনই থানা শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে বইয়ের বিষয়ে খোঁজ নেন বলে তিনি জানান।
মাধ্যমিকের সব শ্রেণিতেও একই অবস্থা। পোগোজ স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী তামিম ১২টি বইয়ের মধ্যে পেয়েছে ৮টি। গণিত, বিজ্ঞান অনুসন্ধানী পাঠ, ডিজিটাল প্রযুক্তি, স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং ইসলাম শিক্ষা বই কবে পাওয়া যাবে, তা জানেন না তার অভিভাবকরা।
ঢাকা কলেজিয়েট স্কুল, মুসলিম হাইস্কুল, বাংলাবাজার সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, উইলস লিটল ফ্লাওয়ার্স প্রিপারেটরি স্কুলের বিভিন্ন শ্রেণির শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মাধ্যমিক পর্যায়ে সপ্তম থেকে নবম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা তাদের সব পাঠ্যবই পায়নি। কয়েকজন শিক্ষার্থী জানায়, টিচাররা আমাদের বলছেন, বই দেবেন। কিন্তু বই পাচ্ছি না। স্কুলে নাকি বই আসেনি। কতগুলো দিন চলে গেল, কিন্তু পড়া শুরু করতে পারিনি সেভাবে।
সেন্ট ফ্রান্সিস জেভিয়ার্স গালর্স স্কুল অ্যান্ড কলেজের ছাত্রী ইমার বাবা রফিকুল ইসলাম মনে করেন, মহামারি করোনায় শিক্ষার্থীরা ক্ষতির মুখে পড়েছে। বই বিতরণে বিলম্ব হওয়ায় সেই ক্ষতি আরও বাড়বে। তিনি বলেন, প্রতিটা ক্লাসেই যদি এমন হয়, তাহলে কিভাবে হবে? যে ৩টি বিষয় ওরা পেল না, সেটি তো পড়তে পারল না। পদার্থবিজ্ঞান বিষয়টিই ওদের কাছে নতুন। ১০ দিন চলে গেল। কবে বই পাবে তাও জানি না।
২০১০ সাল থেকে বছরের প্রথম দিন উৎসব করে প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের শিক্ষার্থীদের হাতে বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক তুলে দিচ্ছে সরকার। ২০১০ সাল থেকে এ পর্যন্ত ১৪ বছরে আওয়ামী লীগ সরকার মোট ৪৩৪ কোটি ৪৫ লাখ ৮০ হাজার ২১১ কপি বই বিনামূল্যে বিতরণ করেছে। এবার ৪ কোটি ৯ লাখ ১৫ হাজার ৩৮১ জন শিক্ষার্থীকে ৩৩ কোটি ৯১ লাখ ১২ হাজার ৩০০ কপি পাঠ্যবই বিনামূল্যে দেওয়া হচ্ছে।
দেরিতে দরপত্র প্রক্রিয়া করা, কার্যাদেশে বিলম্ব, কাগজ সংকট, লোডশেডিং- এসব কারণে শুরুতেই পাঠ্যবই নিয়ে সংকট তৈরি হয়। বাজারে অব্যবহৃত (ভার্জিন) পাল্পের চরম ঘাটতি দেখা দেয়। এ কারণে ৮৫ শতাংশ উজ্জ্বলতার কাগজ পাওয়া যায়নি। এমনকি পুনর্ব্যবহৃত (রিসাইকেল বা পুরোনো কাগজ প্রক্রিয়া করে বানানো) পাল্প বা মন্ডেরও ঘাটতি আছে। এ সুযোগে পুরোনো কাগজ সরবরাহকারী এবং কাগজ উৎপাদনকারীদের অনেকে সিন্ডিকেট করে ফেলে।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, এনসিটিবির নমনীয়তা আর কাগজের এই সংকট পুঁজি করে কিছু মুদ্রাকর নিউজপ্রিন্ট আর নিম্নমানের কাগজে বই ছাপিয়েছে। বইয়ের কাগজ, রং, বাঁধাই, মলাট সব নিয়েই রয়েছে বিস্তর অভিযোগ।
এ বিষয়ে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. ফরহাদুল ইসলাম সময়ের আলোকে বলেন, কাগজের সংকট ছিল। দেশে ভার্জিন পাল্প ছিল না। এ জন্য উজ্জ্বলতায় ছাড় দেওয়া হয়েছে। এরপরেও সংকটের সুযোগ নিয়েছে অনেকে। তিনি বলেন, নানা কারণে প্রাথমিকের পাঠ্যবই ছাপানোর কাজ দেরিতে শুরু হয়েছে। শতভাগ বই পৌঁছানোর কাছাকাছি আছি বলে তিনি মন্তব্য করেন।

Join the conversation