05:39:45 pm
Sunday, June 21

ইভিএম প্রকল্প নিয়ে পরিকল্পনা কমিশনের লুকোচুরি

আগামী জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম)। ১৫০ আসনে ইভিএমে ভোট গ্রহণের টার্গেট নিয়ে এগোচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এ জন্য ৮ হাজার ৭১১ কোটি টাকা ব্যয়ে ২ লাখ ইভিএম কেনার একটি প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে ইসি।

আগামী জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম)। ১৫০ আসনে ইভিএমে ভোট গ্রহণের টার্গেট নিয়ে এগোচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এ জন্য ৮ হাজার ৭১১ কোটি টাকা ব্যয়ে ২ লাখ ইভিএম কেনার একটি প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে ইসি। ইভিএম কেনার এ প্রকল্প নিয়ে শুরু থেকেই লুকোচুরি করছে পরিকল্পনা কমিশন। আজ অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে, অথচ গতকাল রাত পর্যন্ত প্রকল্পটি একনেকে উঠবে কি না নিশ্চিত করতে পারেনি পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের এ উইং। তবে পরিকল্পনা কমিশনের এক সদস্য জানিয়েছেন, যদি প্রধানমন্ত্রী চান তাহলে আজ একনেকে উঠতে পারে প্রকল্পটি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পরিকল্পনা কমিশনের একাধিক কর্মকর্তা সময়ের আলোকে বলেন, ইভিএম প্রকল্পের কোনো তথ্য যেন ফাঁস না হয় সে জন্য নির্দেশনা দেওয়া আছে। যারা এ প্রকল্পের সংশোধনসহ নানা কাজে জড়িত তাদের কাছে প্যাকেটে মোড়ানো অবস্থায় আসে। আবার কাজ শেষ হলে প্যাকেটে করে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ইভিএম প্রকল্প আজ অনুষ্ঠেয় জাতীয় একনেক সভায় সরাসরি উত্থাপন হতে পারে। সভার আলোচ্য সূচিতে ১১টি প্রকল্পের নাম থাকলেও ইভিএম প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত নেই। এ ছাড়া প্রতিটি প্রকল্প অনুমোদনের আগে প্রস্তাবিত তথ্য যাচাইয়ের জন্য প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা অনুষ্ঠিত হলেও এখনও এ প্রকল্পের জন্য ওই সভা করা হয়নি।

এ প্রকল্প একনেক সভায় উত্থাপনের জন্য গত বুধবার থেকে হঠাৎ করেই তৎপরতা বেড়ে যায় পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তাদের। ইভিএম প্রকল্পের পরিচালক কর্নেল রাকিব হাসান এসে পরিকল্পনা কমিশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা প্যামস্টং উইংয়ের যুগ্ম প্রধান আবদুর রউফ তালুকদারের সঙ্গে দেখা করেন। সেখানে দীর্ঘ সময় তাদের মধ্যে বৈঠক হয়। বৈঠকে কী বিষয়ে আলোচনা হয়, সেই বিষয়ে গণমাধ্যমে কথা বলেননি তারা।

আজ একনেক সভায় ইভিএম প্রকল্প উত্থাপন করা হবে কি না জানতে চাইলে পরিকল্পনা কমিশনের আর্থসামাজিক অবকাঠামো বিভাগের সদস্য (সচিব) মোসাম্মৎ নাসিমা বেগম সময়ের আলোকে বলেন, ইভিএম একটি বড় প্রকল্প। অন্যান্য প্রকল্পের মতো এ প্রকল্পেও সবদিক দেখা হচ্ছে। প্রকল্পের এখনও পিইসি সভা হয়নি। সাধারণত একটি প্রকল্পের পিইসি সভা শেষ হওয়ার এক সপ্তাহ পর সেটি একনেকে অনুমোদনের জন্য উত্থাপন করা হয়। 

এ প্রকল্পের ক্ষেত্রে কিছুটা ভিন্ন হতে পারে। প্রধানমন্ত্রী যদি কাল (আজ) চান তবে এটি একনেকে উত্থাপন করা হবে এবং অনুমোদনও হতে পারে। আজ একনেক সভায় এটি উত্থাপন হতে পারে এর আগে এক সংবাদ সম্মেলনে এমন ইঙ্গিত দিয়েছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান। তিনি বলেছিলেন, ১৫ জানুয়ারির মধ্যে ইভিএম প্রকল্প পাস হতে হবে এমন কোনো ডেডলাইন নেই। এটি ১৭ জানুয়ারিও হতে পারে। কিংবা যেকোনো সময় হতে পারে। তবে সেটি শিগগিরই হতে যাচ্ছে।

এর আগে নির্বাচন কমিশনার আলমগীর ও বেগম রাশেদা সুলতানা বলেছিলেন, ১৫ জানুয়ারির মধ্যে ইভিএম প্রকল্প অনুমোদন না পেলে আগামী নির্বাচনে ১৫০ আসনে ইভিএমে নির্বাচন সম্ভব নয়।

প্রকল্পের যেসব ব্যয় নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন : প্রকল্প প্রস্তাবে দুই লাখ ইভিএম কিনতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৬ হাজার ৬৬০ কোটি টাকা। ইভিএম আনা-নেওয়ার কাজে ২৬৪ কোটি টাকায় ৫২৪টি ডাবল কেবিন পিকআপ কেনার কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া ইভিএম রাখতে ৩৭০ কোটি টাকায় ১০টি ওয়্যারহাউস নির্মাণ করার কথা বলা হয়েছিল। পরিকল্পনা কমিশন বলেছে, এতগুলো গাড়ি না কিনে ভাড়া নিতে। আর ওয়্যারহাউস নির্মাণের বিকল্প কিছু করা যায় কি না সেই বিষয়েও পরামর্শ দেওয়া হয়।

পরিকল্পনা কমিশনের এমন আপত্তির বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক কর্নেল রাকিবুল হাসান সময়ের আলোকে বলেছিলেন, বাংলাদেশের কোথাও একসঙ্গে এতগুলো গাড়ি ভাড়া পাওয়া যাবে না। এমন সক্ষমতার কোনো কোম্পানি থাকলে পরিকল্পনা কমিশন যদি আমাদের জানায় সেই ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নেব। আর ওয়্যারহাউস নির্মাণের কোনো বিকল্প নেই। এর আগের প্রকল্পের আওতায় কেনা ১ লাখ ৫০ লাখ ইভিএমের মধ্যে ১২ হাজার নষ্ট হয়ে গেছে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে। ওয়্যারহাউস নির্মাণ করলে এ সমস্যা হবে না।

প্রতিটি প্রকল্প নেওয়ার আগে সমীক্ষা করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও এ প্রকল্প ছিল ব্যতিক্রম। এ নিয়েও আপত্তি ছিল পরিকল্পনা কমিশনের। এ বিষয়ে ইভিএম প্রকল্পের পরিচালক জানান, সমীক্ষা করতে গেলে আগামী নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করা যাবে না। তাই সমীক্ষা করা হয়নি।

প্রকল্প প্রস্তাবে যা বলা হয়েছে : প্রকল্প প্রস্তাবে বলা হয়, আগামী সংসদ নির্বাচনে ৪৫ হাজার ভোটকেন্দ্র থাকবে। এর মধ্যে ইভিএমে ভোট হবে এ রকম ১৫০ আসনে, কেন্দ্র থাকবে ২৫ হাজার। প্রতি কেন্দ্রে ৭টি করে ইভিএম থাকবে। প্রতিটি কক্ষে গড়ে দেড়টি করে মোট দুই লাখ ৬২ হাজার ৫০০টি ইভিএম সেটের প্রয়োজন হবে। এর বাইরে ভোটারদের শিখনের জন্য প্রতি কেন্দ্রে দুটি করে ৫০ হাজার এবং প্রশিক্ষণে ব্যবহারের জন্য আরও ২৫ হাজার প্রয়োজন হবে। 

এ ছাড়া রিজার্ভ হিসেবে আরও ৫০০ ইভিএমের প্রস্তাব করা হয়েছে। সব মিলিয়ে মোট ৩ লাখ ৩৮ হাজার ইভিএমের প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছে ইসি। এসব সেট সংরক্ষণেও বিশাল খরচ গুনতে হবে। ১০টি অঞ্চলে স্টিল কাঠামোর ওয়্যারহাউস নির্মাণ করা হবে। এতদিন ইভিএম সেট সংরক্ষণে মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি বকেয়া বাবদ ৩৬ কোটি ২১ লাখ টাকা দাবি করেছে। 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ইসি ৩ লাখ ৩৮ হাজার ইভিএম সেট কেনার প্রস্তাব করেছে। এর মধ্যে ১ লাখ ৩৮ হাজার সেট ইসির হাতে রয়েছে। নতুন কিনতে হবে ২ লাখ সেট। প্রতিটি সেটের দাম ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৫ হাজার টাকা। কমিশনের হাতে থাকা বর্তমানের প্রতিটি ইভিএম সেট কেনা হয় ২ লাখ ৫ হাজার টাকায়। অর্থাৎ প্রতিটি মেশিনে ১ লাখ টাকা করে বেশি দাম ধরা হয়েছে। প্রস্তাবে ৪টি জিপ গাড়ি এবং ৫৩৪টি ডাবল কেবিন পিকআপ কেনার কথা বলা হয়েছে।