অপারেশন জ্যাকপট’ সিনেমা ঘিরে নানা বিতর্ক
‘অপারেশন জ্যাকপট’ চলচিত্র নির্মাণ নিয়ে চলছে নানা বিতর্ক। এরই মধ্যে এই সিনেমা নিয়ে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। এ সিনেমা নির্মাণে খোদ মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের দিকে আঙুল তুলেছেন অনেকে। তবে কারও অভিযোগ থাকলে সরাসরি কথা বলতে বলা হচ্ছে মন্ত্রণালয় থেকে। গত কয়েক দিন ধরে ‘অপারেশন জ্যাকপট’ নিয়ে সিনেমাপাড়ায় নানা গুঞ্জন চলছে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় নৌ-সেক্টর পরিচালিত সফলতম গেরিলা অপারেশন ‘অপারেশন জ্যাকপট’। ১৯৭১ সালের ১৬ আগস্ট প্রথম প্রহরে দেশের দুটি সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম ও মোংলা এবং দুটি নদীবন্দর চাঁদপুর ও নারায়ণগঞ্জে একযোগে একই নামে পরিচালিত অপারেশনগুলো চালানো হয়েছিল। এসব অপারেশনে পাকিস্তান ও আরও কয়েকটি দেশ থেকে আসা অস্ত্র, খাদ্য ও তেলবাহী ২৬টি জাহাজ ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
এ ঐতিহাসিক ঘটনা নিয়ে নির্মিত হতে যাচ্ছে সিনেমা ‘অপারেশন জ্যাকপট’। প্রথমে সিনেমাটির নির্মাণ তদারকির দায়িত্ব ছিল নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের কাছে। সে সময়ে তারা চলচ্চিত্র নির্মাতা গিয়াস উদ্দিন সেলিমকে সিনেমাটির চিত্রনাট্য তৈরি ও পরিচালনার দায়িত্ব দেয়। চিত্রনাট্য তৈরিতে কয়েক বছর কাজও করেন সেলিম। তবে বছর দেড়েক আগে তদারকির দায়িত্ব পায় মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়।
‘অপারেশন জ্যাকপট’ সিনেমা প্রকল্পের আনুমানিক ব্যয় ধরা হয়েছে ২৩ কোটি ২৩ লাখ ৩৫ হাজার টাকা। সিনেমাটি নির্মাণের কাজ পেয়েছে কিবরিয়া ফিল্মস। এমন খবর ছড়িয়ে পড়লে সিনেমাটি নির্মাণের আগেই বিতর্ক সৃষ্টি হয়। ‘অপারেশন জ্যাকপট’ সিনেমার পুরো প্রকল্প প্রক্রিয়ায় অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলেছেন নির্মাতা গিয়াস উদ্দিন সেলিম ও মোরশেদুল ইসলাম।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ইতিমধ্যে সিনেমাটির প্রকল্প থেকে বাদ পড়েছেন গিয়াস উদ্দিন সেলিম। তিনি সময়ের আলোকে বলেন, ‘আমি এই সিনেমার গল্প ও চিত্রনাট্য নিয়ে প্রায় পাঁচ বছর কাজ করেছি। আমার স্ক্রিপ্ট মূল্যায়ন করে রাখা হলো। এরপর মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সিনেমাটির জন্য একটি কমিটি গঠন করে। সেখানে ছিলেন চলচ্চিত্রকার মোরশেদুল ইসলাম, নাসিরউদ্দীন ইউসুফ ও জুনায়েদ হালিম। তাদের পরামর্শ অনুযায়ী আমরা স্ক্রিপ্টটা ঠিক করি। পরে আমি জানতে পারি, চিত্রনাট্য কমিটিতে ছিলাম বলে টেন্ডারে অংশ নিতে পারব না।’
সিনেমাটির প্রকল্পে অনিয়ম হয়েছে দাবি করে গিয়াস উদ্দিন সেলিম বলেন, মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয় ‘অপারেশন জ্যাকপট’ নিয়ে একটি কমিটি করেছে। সেখানে আমাকে রেখে আমার বুদ্ধি-পরামর্শ নিয়েছে। তারা জানত কমিটিতে যে থাকবে, সে টেন্ডারে অংশ নিতে পারবে না। তারা চেয়েছে আমি যেন সিনেমাটি করতে না পারি। তাই আমাকে কমিটিতে রেখেছে। এ ছাড়া আর কোনো কারণ নেই। আমি যেন ছবিটি না করতে পারি। পরিকল্পনা করেই আমাকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এটা অন্যায়।
এই নির্মাতা আরও বলেন, এই সিনেমার টেন্ডার প্রক্রিয়ায় ম্যানিপুলেশন হয়েছে। এর সুনির্দিষ্ট প্রমাণও আমার কাছে আছে। আমাকে কেন কমিটিতে রাখা হলো, পরে টেন্ডারে কেন অংশ নিতে দেওয়া হলো না। এটাই আমার প্রশ্ন?
সিনেমাটি নিয়ে গত পাঁচ বছর ধরে গবেষণার কাজ করেছেন সেলিম। এ জন্য কোনো পারিশ্রমিক পাননি বলে জানান চলচ্চিত্র নির্মাতা। এ বিষয়ে ‘অপারেশন জ্যাকপট’ প্রকল্প নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাতা মোরশেদুল ইসলাম বলেন, আজ থেকে চার-পাঁচ বছর আগে এই ছবির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। সে সময় গিয়াস উদ্দিন সেলিমকে দিয়ে সিনেমাটি করা হবে- এমনই কথা ছিল। তখন একটি কমিটি করে দেওয়া হয়েছিল। সেই কমিটিতে আমরা তিনজন ছিলাম। সিনেমাটিতে কিছু সাজেশন দিয়ে স্ক্রিপ্ট ও চিত্রনাট্য ঠিক করা হয়েছিল। হঠাৎ করে শুনতে পেলাম সিনেমার জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। টেন্ডার করে যাদের দেওয়া হয়েছে, স্ক্রিপ্টটা আদৌ লেখা হয়েছে কি না, স্ক্রিপ্টটা কারা মূল্যায়ন করেছে। সেটা আমরা জানি না।
তিনি আরও বলেন, সরকারি সিনেমার যেকোনো প্রকল্প হলে যাচাই-বাছাইয়ের একটা বিষয় থাকে। শুধু আমলারা বাছাই করলে তো হবে না। টেন্ডার দিয়ে শিল্পচর্চা হয় না। আমার কাছে মনে হচ্ছে, এখানে একটা দুর্নীতির বিষয় ঘটেছে। স্ক্রিপ্টটা আসলে কারা মূল্যায়ন করেছে? এ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন মোরশেদুল ইসলাম।
‘অপারেশন জ্যাকপট’ সিনেমার প্রকল্প নিয়ে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ প্রসঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব খাজা মিয়া সময়ের আলোকে বলেন, যারা অনিয়ম এবং দুর্নীতির অভিযোগ তুলেছেন, তারা মন্ত্রণালয়ে এসে কথা বলতে পারেন। কিন্তু তারা গণমাধ্যমে একটা মন্ত্রণালয় ও একজন সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কথা বলছেন। এটা ঠিক নয়।
সিনেমাটির প্রকল্প প্রক্রিয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, নিয়ম মেনেই সরকারি প্রক্রিয়ায় এ প্রকল্পের কাজটি হতে যাচ্ছে। কোনো লুকোচুরি নয়, ওপেন টেন্ডার করা হয়েছে। যোগ্য প্রতিষ্ঠান সিনেমাটির কাজ করবে।
সিনেমাটির কাজ কবে নাগাদ শুরু হতে পারে? এমন প্রশ্নের জবাবে খাজা মিয়া বলেন, এই সিনেমায় একজন প্রকল্প পরিচালক আছেন। তিনি সবকিছু চূড়ান্ত করার পরই মন্ত্রণালয়ের প্রক্রিয়া শুরু হবে। এখানে আমি একা কোনো কিছু সিদ্ধান্ত দেওয়ার ক্ষমতা রাখি না।
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, শিগগিরই সিনেমাটির প্রকল্পের কার্যাদেশ দেওয়া হবে।
বিষয়টি নিয়ে কিবরিয়া ফিল্মসের কর্ণধার প্রযোজক গোলাম কিবরিয়া লিপু বলেন, এখনও কোনো কিছুই চূড়ান্ত হয়নি। নিয়ম মেনে আমরা টেন্ডারে অংশ নিয়েছি। সবকিছু শিগগিরই আনুষ্ঠানিকভাবে জানাতে পারব।
এ সংস্থার প্রস্তাবিত দুই চিত্রনাট্যকার হলেন- ছটকু আহমেদ ও কাসেম আলী দুলাল। প্রস্তাবিত চার চিত্র পরিচালক হলেন- দেলোয়ার জাহান ঝন্টু (বাংলাদেশ), স্বপন চৌধুরী (বাংলাদেশ), জেপি দত্ত (ভারত) এবং অনিরুদ্ধ রায় (ভারত)।
প্রস্তাবিত বাংলাদেশের দুই নির্মাতার নাম নিয়ে চলচ্চিত্রাঙ্গনে নানা বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। দেশের দুই গুণী নির্মাতা নাসির উদ্দীন ইউসুফ ও মোরশদুল ইসলামকে ইঙ্গিত করে কটাক্ষ করেছেন বর্ষীয়ান নির্মাতা দেলোয়ার জাহান ঝন্টু।
কিবরিয়া ফিল্মসের প্রস্তাবিত ‘অপারেশন জ্যাকপট’ সিনেমায় অভিনয়শিল্পীদের তালিকায় আছেন- শাকিব খান, ওমর সানি, মোশাররফ করিম, রিয়াজ, মৌসুমী, পূর্ণিমা, অপু বিশ্বাস, নিপুণ, মিশা সওদাগর, ববিতা, আহমেদ শরীফ, সুচরিতা, চম্পা, কাজী হায়াৎ, আবুল হায়াৎ, ভারতের রানী মুখার্জি, সানি দেওল, সুনীল শেঠি, ফারদিন খান, শর্মিলা ঠাকুর, সুস্মিতা সেন, জিনাত আমান ও জয়া বচ্চন।

Join the conversation