04:56:50 am
Sunday, June 21

শিল্পে ধস নামার আশঙ্কা

শিল্পের চাকা ঘুরতে গ্যাস-বিদ্যুতের কোনো বিকল্প নেই। অথচ মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে সরকার অস্বাভাবিক হারে দাম বাড়িয়েছে গ্যাস ও বিদ্যুতের। শিল্পে গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়েছে সর্বোচ্চ ১৭৮ শতাংশ পর্যন্ত

শিল্পের চাকা ঘুরতে গ্যাস-বিদ্যুতের কোনো বিকল্প নেই। অথচ মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে সরকার অস্বাভাবিক হারে দাম বাড়িয়েছে গ্যাস ও বিদ্যুতের। শিল্পে গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়েছে সর্বোচ্চ ১৭৮ শতাংশ পর্যন্ত। তার আগে কয়েক দফায় বাড়ানো হয়েছে বিদ্যুতের দাম। এর ফলে অনেক শিল্প কারখানার চাকা থমকে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন শিল্প মালিকরা।

বৈশ্বিক সংকট, কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, রফতানি আদেশ কম আসা, রফতানি করা পণ্যের মূল্য সময়মতো শোধ না করার মতো বহুমুখী সংকটে আগে থেকেই জেরবার শিল্প মালিকরা। এই অবস্থার মধ্যে গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি শিল্পে বিপর্যয় ডেকে আনবে বলেও মনে করছেন উদ্যোক্তারা। গ্যাসের বর্ধিত মূল্য আরও হ্রাস করার জন্য আগামী সপ্তাহেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দ্বারস্থ হবে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো। ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।


গ্যাসের দাম বৃদ্ধির কারণে একেকটি শিল্প কারখানায় শুধু গ্যাস বাবদ খরচ কেমন বাড়বে তার একটি চিত্র সময়ের আলোর কাছে তুলে ধরেন বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) নির্বাহী সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম। তিনি বলেন, বিকেএমইএর সদস্যভুক্ত নারায়ণগঞ্জের একটি ছোট কারখানা মালিককে এই বর্ধিত মূল্যের আগের রেট অনুযায়ী প্রতি মাসে গ্যাসের বিল দিতে হতো ৫৮ লাখ টাকা, বর্ধিত মূল্য অনুযায়ী তাকে এখন মাসে গ্যাস বিল দিতে হবে ১ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। মাঝারি একটি কারখানায় মাসের বিল ছিল ১ কোটি ২০ লাখ টাকা, এখন দিতে হবে ২ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। আরেকটি মাঝারি কারখানায় আগে মাসিক গ্যাস বিল দিতে হতো ১ কোটি ৮৫ লাখ টাকা, এখন তাকে দিতে হবে ৪ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। অর্থাৎ তাকে আগের চেয়ে গ্যাস বিল বেশি দিতে হবে ২ কোটি ৭১ লাখ টাকা। আরেকটি কারখানায় আগে মাসিক গ্যাস বিল দিতে হতো ২ কোটি ৫০ লাখ টাকা, এখন দিতে হবে ৬ কোটি ২৬ লাখ টাকা। একটি বড় কারখানায় আগের রেট অনুযায়ী গ্যাসের বিল দিতে হতো ৫ কোটি ৩৯ লাখ টাকা, নতুন রেট অনুযায়ী এখন মাসে গ্যাস বিল দিতে হবে ১৩ কোটি ৪৯ লাখ টাকা। অর্থাৎ আগের চেয়ে ওই কারখানা মালিককে প্রতি মাসে গ্যাসের বিল বেশি দিতে হবে ৮ কোটি ১০ লাখ টাকা। 

এভাবে প্রতিটি শিল্প কারখানায় গ্যাসের বিল এখন দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ দিতে হবে। এভাবে এক বছরে একটি শিল্প মালিককে ৯৭ কোটি টাকা থেকে ১০০ কোটি টাকার মতো  বেশি গ্যাস বিল দিতে হবে। এক বছরে তো ওই শিল্প মালিক এত টাকা লাভও করেন না। 

সুতরাং গ্যাসের এই বর্ধিত মূল্য বহন করা অনেক বড় শিল্প মালিকের পক্ষেই সম্ভব নয়, ছোট ও মাঝারি শিল্প মালিকদের পক্ষে তো সেটি একেবারেই অসম্ভব। ফলে লোকসান দিতে দিতে একে একে বন্ধ হয়ে যাবে অনেক শিল্প কারখানা। আমরা আশঙ্কা করছি গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির কারণে ১০ শতাংশের মতো শিল্প কারখানা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। আর কর্মহীন হয়ে পড়তে পারেন ৮-১০ লাখ শ্রমিক।

কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদফতরের তথ্য মতে, ১৯৭৩ সালের ৩০ জুনের হিসাব অনুযায়ী ৩১৩টি কারখানা নিয়ে দেশের শিল্প খাতের যাত্রা শুরু হয়। এটি শুধু সরকারের হাতে থাকা শিল্প কারখানার সংখ্যা। বেসরকারি খাতে তখনও তেমন শিল্প প্রতিষ্ঠান ছিল না। এ ছাড়া স্বাধীনতার আগে পাকিস্তান আমলের শেষদিকে এ দেশে ১৯৬৮-৬৯ সালে নিবন্ধিত শিল্প কারখানার সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ১৩০। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ৭৯১টি প্রতিষ্ঠান ছিল বস্ত্র খাতে। এ ছাড়া অনিবন্ধিত কারখানাও ছিল।


স্বাধীনতার পর গত ৫২ বছরে দেশে ব্যাপকভাবে শিল্প খাতের বিকাশ ঘটেছে। শিল্প কারখানার সংখ্যা প্রায় দেড়শগুণ বেড়েছে। এর বদৌলতে উৎপাদনমুখী কলকারখানার সংখ্যা এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৭ হাজারটি। এর মধ্যে বৃহৎ কারখানা প্রায় ৩ হাজার। এগুলো হচ্ছে এখন শিল্প খাতের মেরুদণ্ড। তবে সারা দেশে এখনও ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প কারখানা বেশি হলেও রফতানি আয়ের ৮২ শতাংশ আসে মূলত গার্মেন্টস খাত থেকে।

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোক্তা উন্নয়ন কেন্দ্রের (সিইডি) ম্যাপড ইন বাংলাদেশের তথ্যানুযায়ী, দেশে ৩ হাজার ৪০৯টি পোশাক কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে বিজিএমইএর সদস্য ১ হাজার ৯৪৫ ও বিকেএমইএর সদস্য ৫২১টি। তার বাইরে বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ উভয় সংগঠনের সদস্য ২৫৪টি। কোনো সংগঠনের সদস্য নয়, এমন কারখানার সংখ্যা ৬৮৯। অবশ্য বৃহস্পতিবার বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর সূত্র নিশ্চিত করেছে বর্তমানে বিজিএমইএর সদস্যভুক্ত চালু কারখানার সংখ্যা ২ হাজার ২০০টির মতো এবং বিকেএমইএর সদস্য কারখানার সংখ্যা ৯০০টির মতো। অর্থাৎ বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ- এই দুই সংগঠনের সদস্য কারখানা এখন ৩ হাজার ১০০টির মতো। দুই সংগঠনের সব কারখানাতেই কোনো না কোনো ক্ষেত্রে গ্যাসের দরকার হয়। সুতরাং গ্যাসের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব সরাসরি পড়বে এসব শিল্প কারখানার ওপর।

বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির কারণে সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতির চিত্র তুলে ধরে সময়ের আলোকে বলেন, গার্মেন্টস শিল্পের ওভেন ও নিটওয়্যার- উভয় খাতের কারখানায় কোনোটিতে ডাইয়িংয়ের জন্য গ্যাস দরকার, কোনোটির আয়রনের জন্য, কোনোটিতে বয়লার মেশিন চালু রাখার জন্য আবার কোনোটিতে প্রোডাক্ট ফিনিশিংয়ের জন্য গ্যাসের দরকার। গ্যাসের দাম বৃদ্ধির কারণে এসব কারখানায় ব্যয় বাড়বে ২৫-৩০ শতাংশের মতো। সব মিলিয়ে শিল্পের উৎপাদন ব্যয় বাড়বে ২০-২৫ শতাংশ। অনেক কারখানা মালিক আগের গ্যাসমূল্য অনুযায়ীই বিল দিতে পারেন না, এখন এই বর্ধিত গ্যাস বিল দেওয়া সম্ভব হবে না ক্ষুদ্র, মাঝারি থেকে অনেক বড় শিল্প মালিকের পক্ষেও। ফলে তিতাস কর্তৃপক্ষ কারখানার গ্যাস লাইন বন্ধ করে দেবে। শেষ পর্যন্ত গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির কারণে ১০ শতাংশের মতো কারখানা বন্ধ হয়ে যাবে। কর্মহীন হয়ে পড়বে ৮-১০ লাখের মতো শ্রমিক। শুধু তাই নয়, কারখানা বন্ধ হওয়া মানে রফতানি আয়ও কমে যাবে। গত অর্থবছরে শুধু নিটওয়্যার খাত থেকে পোশাক রফতানিতে আয় হয়েছিল ২৩ বিলিয়ন ডলার। কারখানা বন্ধ হয়ে গেলে স্বাভাবিকভাবেই রফতানি আয়েও ধস নামবে।


এ পরিস্থিতিতে সমাধানের পথ এক জায়গাতেই আছে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা। গ্যাসের অস্বাভাবিক বর্ধিত মূল্য কমানোর দাবি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দ্বারস্থ হবেন ব্যবসায়ীরা।

এ বিষয়ে মোহাম্মদ হাতেম বলেন, আমরা চেষ্টা করছি এফবিসিসিআইয়ের নেতৃত্বে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার। ইতিমধ্যেই এফবিসিসিআই সভাপতি জসিম উদ্দিনের সঙ্গে আমাদের আলোচনা হয়েছে। হয়তো আগামী সপ্তাহের যেকোনো দিন প্রধানমন্ত্রীর দ্বারস্থ হব আমরা। এ ক্ষেত্রে আমরা সরাসরি দেখা করে আমাদের সংকটের কথাগুলো তার কাছে তুলে ধরব, যদি সেটি সম্ভব না হয় তাহলে আমরা লিখিত আকারে আমাদের দাবিগুলো প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরব।

গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির কারণে গার্মেন্টস শিল্পের সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতির চিত্র তুলে ধরে বিজিএমইএর সহ-সভাপতি শহিদুল্লাহ আজিম সময়ের আলোকে বলেন, খুবই ভুল সময়ে সরকার এভাবে অস্বাভাবিক হারে গ্যাসের দাম বাড়িয়েছে। ভুল সময় বললাম এ কারণে- আগে থেকেই নানা কারণে পোশাক শিল্প সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এখন এমনিতেই অনেক কারখানায় কাজ নেই, রফতানি আদেশ এখন দিনকে দিন কম আসছে। ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো পোশাকের ভালো দাম দিতে চাচ্ছে না। এ অবস্থার মধ্যে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির পর এভাবে গ্যাসের দাম বাড়ানোয় শিল্পের সংকট আরও বাড়িয়ে দেবে। নানা কারণে শিল্পের উৎপাদন ব্যয় বিগত কয়েক মাসে ২৫ শতাংশের ওপরে বেড়েছে, এখন উৎপাদন ব্যয় বাড়বে ৩৫-৪০ শতাংশ পর্যন্ত। এ ছাড়া আগে থেকেই শিল্পে পর্যাপ্ত গ্যাস-বিদ্যুৎ পাচ্ছে না, এত চড়া মূল্য দিয়েও যে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ পাব তার কোনো গ্যারান্টি নেই। সামনে গরম কাল আসছে, তখন তো গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট আরও বাড়বে। তাহলে তখন কী পরিস্থিতি দাঁড়াবে সে বিষয়ে আমরা আরও শঙ্কিত।

অর্থনীতিবিদ ও পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির বিষয়ে সময়ের আলোকে বলেন, সরকার হয়তো নিরুপায় হয়েই গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছে। হয়তো সামনে আরও বাড়াবে। তবে সরকার দেখছে যখনই যা কিছুর দাম বাড়ানো হচ্ছে- তা দেশের মানুষের সয়ে যাচ্ছে। কারও কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। এ জন্য দাম বৃদ্ধির আগে সরকার কোনো কিছুই ভাবছে না। তবে সরকার একবারে এত অস্বাভাবিক হারে গ্যাসের দাম না বাড়িয়ে কিছুটা কম করে দাম বাড়াতে পারত।