02:31:34 am
Sunday, August 23

ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ ভয়াবহ রূপ নেওয়ার আশঙ্কা

পশ্চিমাদের কাছে অব্যাহতভাবে অস্ত্র সহায়তা পাচ্ছে কিয়েভ। বৃহস্পতিবার আড়াই বিলিয়ন ডলারের সামরিক সহায়তা প্যাকেজের অংশ হিসেবে ইউক্রেনে কয়েকশ সাঁজোয়া যানসহ হাজার হাজার রকেট ও কামানের গোলা পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ধারাবাহিক অস্ত্র সরবরাহের ঘোষণার বিপরীতে ইউক্রেনে সম্পূর্ণ নতুন মাত্রার যুদ্ধের হুঁশিয়ারি দিয়েছে রাশিয়া। 
ক্রেমলিন সতর্ক করেছে, সামরিক জোট ন্যাটো যদি ইউক্রেনে যুদ্ধ ট্যাঙ্ক এবং দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার মতো ভারী অস্ত্র দেয় তাহলে চলমান যুদ্ধ ‘অত্যন্ত বিপজ্জনকভাবে’ বৃদ্ধি পাবে। সবমিলে যুদ্ধ ভয়াবহ রূপ নেওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। এদিকে রুশ প্রেসিডেন্ট  ভ্লাদিমির পুতিন বেঁচে আছেন কি না, তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। তার বক্তব্যের কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়ে ক্রেমলিনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, পুতিন কিংবা রাশিয়ার অস্তিত্ব ইউক্রেনের পছন্দ নয়। 
বৃহস্পতিবার মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতরের এক বিবৃতিতে বলা হয়, ইউক্রেনকে প্রায় ২৫০ কোটি ডলার সমমূল্যের সামরিক সহায়তা দেওয়া হবে। তাদের সহায়তা প্যাকেজের মধ্যে আছে সাঁজোয়া যান, আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এবং রকেট ও গোলা। এ সহায়তার মধ্যে আরও থাকছে ৫৯টি ব্র্যাডলি যুদ্ধজাহাজ এবং ৯০টি সাঁজোয়া যান। এর আগে ৯ ইউরোপীয় দেশের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও প্রতিনিধিদের সঙ্গে দেওয়া এক যৌথ বিবৃতিতে যুক্তরাজ্য বলেছে, তারাও ইউক্রেনের জন্য ৬০০ ব্রিমস্টোন ক্ষেপণাস্ত্র পাঠাবে। ডেনমার্ক ফ্রান্সের নির্মিত ১৯টি সিজার হুইটজার এবং সুইডেন তাদের আর্চার কামানব্যবস্থা পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা জোরদারের লক্ষ্যে আয়োজিত জার্মানির রামস্টেইনে শুক্রবারের বৈঠককে সামনে রেখে এ সহায়তা ঘোষণা করা হয়। 
নতুন অস্ত্র সহায়তার বিষয়ে বৃহস্পতিবার ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ সাংবাদিকদের বলেন, ‘সম্ভবত, এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক। এর অর্থ হলোÑসংঘাতকে সম্পূর্ণ নতুন স্তরে নিয়ে যাওয়া যা অবশ্যই বৈশি^ক এবং সমগ্র-ইউরোপীয় নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে ভালো হবে না।’ ইউক্রেনকে ট্যাঙ্ক পাঠালে কঠিন পরিণতি ভোগ করতে হবে বলে হুঁশিয়ার করেছেন তিনি। 
অবশ্য যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্য ও অন্যদের ঘোষিত সহায়তা প্যাকেজে ইউক্রেনের চাওয়া পশ্চিমা প্রযুক্তির ট্যাঙ্ক নেই। তবে গতকাল শুক্রবার কিয়েভকে সহায়তা দেওয়ার বিষয়ে জার্মানিতে ন্যাটোর ৩০ দেশসহ অন্তত ৫০টি দেশের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও অন্য কর্মকর্তাদের এক বৈঠক হয়। সেখানে ইউক্রেনকে ট্যাঙ্ক সরবরাহের জন্য জার্মানিকে চাপ দেওয়া হয়। এই খবর লেখা পর্যন্ত সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হয়নি। মার্কিন প্রতিরক্ষাপ্রধান লয়েড অস্টিন এই সমন্বয় বৈঠকের আয়োজন করছেন। তিনি বলছেন, ‘দীর্ঘ পথ চলার জন্য ইউক্রেনের আত্মরক্ষার কাজকে সহায়তা করতে আমরা আমাদের ঐক্যবদ্ধ প্রতিশ্রুতি পুনর্নবীকরণ করব’। তবে নির্দিষ্ট নতুন কোনো সরঞ্জামের উল্লেখ তিনি করেননি।
মূলত যুক্তরাজ্য গত সপ্তাহে ইউক্রেনে চ্যালেঞ্জার ২ ট্যাঙ্ক পাঠানোর কথা ঘোষণা করায় বার্লিন তার লিওপার্ড ২ ট্যাঙ্ক সরবরাহ করার জন্য বা অন্তত পোল্যান্ডের মতো অন্য দেশগুলো তাদের নিজস্ব স্টক থেকে জার্মান তৈরি সরঞ্জাম সরবরাহ করার জন্য ক্রমবর্ধমান চাপের সম্মুখীন হয়েছে। অন্যদিকে রাশিয়ার সামরিক বাহিনী এবং রুশ ভূখ-ে আঘাত হানতে সক্ষম ভারী অস্ত্র ইউক্রেনকে না দিতে পশ্চিমা দেশগুলোকে বরাবরই চাপ দিয়ে আসছে ক্রেমলিন।
কিয়েভের পশ্চিমা অংশীদারদের আশঙ্কা, ইউক্রেন রাশিয়ার ভূখ- বা ক্রিমিয়ার অভ্যন্তরে হামলার জন্য দূরপাল্লার অস্ত্র ব্যবহার করতে পারে। যদিও কিয়েভ সেই ধরনের কোনো হামলা করবে না বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে মস্কোর রাষ্ট্রদূত আনাতোলি আন্তোনভ বলেছেন, ইউক্রেন রাশিয়া বা ক্রিমিয়া উপদ্বীপকে লক্ষ্যবস্তু করে হামলা চালাতে পশ্চিমা সরবরাহকৃত অস্ত্র ব্যবহার করলে রাশিয়া প্রতিশোধ নেবে। তিনি বলেন, ‘এটা সবার কাছে সুস্পষ্ট হওয়া উচিত, জেলেনস্কি সরকারকে আমেরিকান বা ন্যাটো যে অস্ত্রই সরবরাহ করুক না কেন, আমরা তা ধ্বংস করব। রাশিয়াকে পরাজিত করা অসম্ভব।’ ইউক্রেনের বিষয়ে মার্কিন বাগাড়ম্বরপূর্ণ বক্তব্য ‘আরও বেশি যুদ্ধভাবাপন্ন’ হয়ে উঠছে বলেও দাবি করেন তিনি।
আন্তোনভ আরও বলেন, একদিকে ক্রিমিয়াকে ইউক্রেনের অংশ বলে উল্লেখ করা এবং অন্যদিকে কিয়েভ তার ভূখ- রক্ষার জন্য মার্কিন অস্ত্র ব্যবহার করতে পারে বলে উল্লেখ করে ওয়াশিংটন ‘মূলত রাশিয়ায় সন্ত্রাসী কর্মকা- করতে ইউক্রেনীয় সরকারকে চাপ দিচ্ছে’। পৃথকভাবে সাবেক রুশ প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভ সতর্ক করেছেন, ইউক্রেনের প্রতি পশ্চিমাদের অব্যাহত সহায়তা চলমান যুদ্ধকে পারমাণবিক যুদ্ধের দিকে নিয়ে যেতে পারে।
মেদভেদেভ টেলিগ্রাম মেসেজিং অ্যাপে লিখেছেন, ‘প্রচলিত যুদ্ধে পরমাণু শক্তিধর দেশের পরাজয় পারমাণবিক যুদ্ধকে উসকে দিতে পারে। পারমাণবিক শক্তিধর দেশগুলো বড় সংঘাতে হারেনি কারণ এর ওপরই তাদের ভাগ্য নির্ভর করে।’ মেদভেদেভের এই মন্তব্যকে রাশিয়ার পারমাণবিক মতবাদের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছেন ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ।
পুতিন বেঁচে আছেন কি না, সন্দেহ জেলেনস্কির: পুতিন বেঁচে আছেন কি না, তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। বৃহস্পতিবার ডাভোসে তার কাছে জানতে চাওয়া হয় ‘কবে শান্তি আলোচনা শুরু হবে’। জবাবে জেলেনস্কি বলেন, ‘আজ আমি আসলে বুঝতে পারছি না, কার সঙ্গে কথা বলব, কোন বিষয়ে কথা বলব। আমি আসলে নিশ্চিত নই রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট, যিনি মাঝেমধ্যে সবুজ পর্দার সামনে হাজির হন, তিনি আসল কি না। আমি বুঝতে পারি না তিনি বেঁচে আছেন কি না, তিনি সব সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন কি না, নাকি অন্য কেউ নিচ্ছে।’ 
জেলেনস্কির বক্তব্যের কড়া প্রতিক্রিয়া ক্রেমলিনের: এদিকে জেলেনস্কির এমন বক্তব্যের কয়েক ঘণ্টা পর কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ। ফক্স নিউজ তাকে উদ্ধৃত করে জানায়, ‘রাশিয়া ও পুতিন যে ইউক্রেন ও জেলেনস্কির জন্য বড় একটি সমস্যা, তা পরিষ্কার। আর এটাও স্পষ্ট যে জেলেনস্কি মন থেকে চান, রাশিয়া ও পুতিনের কোনো অস্তিত্ব না থাকুক। তবে যত তাড়াতাড়ি তিনি বুঝবেন রাশিয়ার অস্তিত্ব আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে, একটি দেশ হিসেবে ইউক্রেনের জন্য ভালো হবে।’

Share this post

Join the conversation