03:59:02 pm
Tuesday, August 25

চট্টগ্রাম বন্দরের ভিড়তে শুরু করেছে ১০ মিটার ড্রাফটের জাহাজ

চট্টগ্রাম বন্দর চ্যানেলে গভীরতা কম থাকায় ৯.৫ মিটার গভীরতার জাহাজ এতদিন ভিড়তে পারত না মূল জেটিতে। বহির্নোঙরে কিছু পণ্য খালাসের পর জাহাজ বন্দরে প্রবেশ করত। সম্প্রতি কর্ণফুলীর মোহনা থেকে পশ্চিমে খননকাজের পর গভীরতা বাড়ায় নতুন দুয়ার উন্মোচিত হলো চট্টগ্রাম বন্দরের। 
সক্ষমতা বাড়ার ফলে প্রথমবারের মতো চট্টগ্রাম বন্দরের জেটিতে বার্থিং হলো ২০০ মিটার দৈর্ঘ্য এবং ১০ মিটার ড্রাফটের (গভীরতা) একটি জাহাজের। মার্শাল আইল্যান্ডের পতাকাবাহী এমভি কমন অ্যাটলাস নামের ওই জাহাজ গত রোববার বিকালে ৩৬ হাজার মেট্রিকটন চিনি নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের সিসিটি-১ জেটিতে ভিড়ে।
বন্দর চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এম শাহজাহান জানান, কর্ণফুলী নদী এবং বন্দর চ্যানেল নিয়ে সামগ্রিক একটি জরিপ ও গবেষণাকাজ করেছে লন্ডনভিত্তিক প্রতিষ্ঠান এইচ আর ওয়েলিংপোর্ট। তাদের প্রতিবেদনে বন্দরে বেশি গভীরতা ও দৈর্ঘ্যরে জাহাজ প্রবেশের সুযোগ থাকার বিষয়টি ছিল। গত বছরের এপ্রিলে তাদের দেওয়া প্রাথমিক প্রতিবেদনে ১০ মিটারের বেশি ড্রাফট এবং ২০০ মিটার দৈর্ঘ্যরে জাহাজ প্রবেশের বিষয়ে সুপারিশ করা হয়। তখন থেকে বন্দর কর্তৃপক্ষ বড় জাহাজ ভেড়ানো নিয়ে কাজ শুরু করে।
বন্দর সূত্র জানায়, স্বাধীনতার আগে চট্টগ্রাম বন্দরের জেটিতে সর্বোচ্চ ১৩৭ মিটার লম্বা এবং ৭ মিটার গভীরতার জাহাজ ভেড়ানোর অনুমতি দেওয়া হতো। সত্তরের দশকে চ্যানেল সংস্কারের পর ১৯৭৫ সালে এই বন্দরে মাত্র সাড়ে ৭ মিটার গভীরতা ও ১৬০ মিটার দীর্ঘ জাহাজ প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হতো।
আরও খননকাজের পর ১৯৮০ সালে ৮ মিটার গভীর ও ১৭০ মিটার দীর্ঘ, ১৯৯০ সালে সাড়ে ৮ মিটার গভীর ও ১৮০ মিটার দীর্ঘ, ১৯৯৫ সালে ৯ মিটার গভীর ও ১৮৫ মিটার দীর্ঘ এবং ২০১৪ সালে সাড়ে ৯ মিটার গভীর ও ১৯০ মিটার দীর্ঘ জাহাজ প্রবেশের সুযোগ সৃষ্টি হয়। এরপর ৮ বছর পর ক্যাপিটেল ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে বালু-মাটি অপসারণ করে গভীরতা বাড়ানো হয়। জেটিসহ এলাকায় পানির স্বাভাবিক গভীরতা এবং জোয়ারের উচ্চতা হিসাব করে এবার ২০০ মিটার দীর্ঘ এবং ১০ মিটার গভীরতার জাহাজের প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চট্টগ্রাম বন্দরে এতদিন যে ধরনের জাহাজ ভেড়ানো হতো শিপিং বাণিজ্যে সেগুলোকে মাঝারি আকৃতির জাহাজ বলা হয়। ১৯০ মিটার লম্বা বা ৯.৫ মিটার ড্রাফটের জাহাজে ২২শ থেকে ২৬শ টিইউএএস কন্টেইনার বোঝাই করা যায়।
 মাত্র আধা মিটার ড্রাফট বৃদ্ধি এবং ১০ মিটার ল্যান্থ বৃদ্ধি করে ১০ মিটার ড্রাফট এবং ২০০ মিটার ল্যান্থের জাহাজে ৩৮শ টিইইউএস পর্যন্ত কন্টেইনার বোঝাই করা যায়। ১০ মিটার ল্যান্থ বাড়ার কারণে গড়ে ১ হাজার কন্টেইনার বাড়তি পণ্যবোঝাই করার সুযোগ তৈরি করবে। ২০০ মিটার লম্বা ও ১০ মিটার ড্রাফটের জাহাজকে বড় জাহাজ বিবেচনা করা হয়। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, আমরা বড় জাহাজ ভেড়ানোর কার্যক্রম শুরু করছি। শুরুতে নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল, চিটাগাং কন্টেইনার টার্মিনাল এবং ১০, ১১ ও ১২ নম্বর জেটিতে ১০ মিটার ড্রাফট এবং ২০০ মিটার লম্বা বড় জাহাজ ভেড়ানোর কার্যক্রম শুরু হবে। যা দেশের কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ের ইতিহাসে নতুন মাত্রা যোগ করবে।
কমবে লাইটার জাহাজনির্ভরতা : ১৩৫ বছর পর চট্টগ্রাম বন্দরের জেটিতে ২০০ মিটার গভীরতা ও ১০ মিটার দৈর্ঘ্যরে বড় জাহাজ ভিড়েছে। ফলে এখন থেকে বহির্নোঙরে বড় জাহাজের মালামাল আর লাইটার জাহাজে খালাস করতে হবে না। এতে লাইটার জাহাজনির্ভরতা কমার পাশাপাশি কমবে আমদানি ব্যয়। যদিও লাইটার জাহাজ মালিকদের দাবি, বড় জাহাজ ভেড়ানোর সুফল পেতে হলে জেটির সংখ্যা বাড়াতে হবে। তাই এখনই কমছে না জাহাজনির্ভরতা।বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, বন্দর জেটিতে সরাসরি ২০০ মিটার দৈর্ঘ্যরে জাহাজ ভেড়ানোর ফলে কন্টেইনার জাহাজের ক্ষেত্রে ১১শ টিইইউএস কন্টেইনার বেশি পরিবহন করা যাবে।
পাশাপাশি বাল্ক কার্গো জাহাজে ১৫-২০ হাজার মেট্রিকটন খোলা পণ্য বেশি পরিবহন করা যাবে। ফলে আমদানিকারকরা সরাসরি জেটিতেই পণ্য খালাস করে নিতে পারবে। ৯ থেকে ১৩ নম্বর জেটি, সিসিটি ও এনসিটি জেটিতে সরাসরি বড় জাহাজগুলো ভিড়তে পারবে। এতে জাহাজ জটের কোনো শঙ্কা থাকছে না। অন্যদিকে লাইটার জাহাজ সংশ্লিষ্টদের শঙ্কা জাহাজ জটের। তাদের দাবি পরিস্থিতি অনুযায়ী বন্দরের ২৫টি জেটি দিয়ে বড় জাহাজের চাপ সামলানো সম্ভব হবে না। জাহাজ জট এড়িয়ে বড় জাহাজ ভেড়ানোর পুরোপুরি সফলতা পেতে হলে বন্দরের আরও অনেক জেটি প্রয়োজন হবে।
জানা গেছে, দীর্ঘ সময় ধরে বন্দর চ্যানেলে গভীরতা কম থাকায় সাড়ে ৯ মিটারের বেশি গভীরতার জাহাজ বন্দরের মূল জেটিতে ভিড়তে পারত না। তাই এতদিন খোলা পণ্যবাহী বিশেষ করে বিভিন্ন শিল্পের কাঁচামাল, গম, সার, সিমেন্ট ক্লিংকার, পাথর, চিনি, সার, খাদ্য পণ্য, স্ক্র্যাপ, কয়লাসহ বিভিন্ন পণ্য বহির্নোঙরে ছোট আকৃতির (লাইটার) জাহাজে খালাস করতে হতো।
বন্দরের বহির্নোঙর থেকে বছরে প্রায় ৫ কোটি টন পণ্য পরিবহন হয়। এর মধ্যে ৭০ ভাগ পণ্য বাল্ক জাহাজ থেকে ছোট ছোট লাইটার জাহাজে খালাস করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাঠানো হয়। বাল্ক জাহাজে একসঙ্গে ৫০-৫৫ হাজার টন পণ্য পরিবহন হয়। আর লাইটার জাহাজের ধারণক্ষমতা ১ হাজার থেকে ২ হাজার টন পর্যন্ত। একটি বড় জাহাজ থেকে পণ্য নিতে ২০ থেকে ২৫টি লাইটার জাহাজের প্রয়োজন। বর্তমানে প্রায় ১ হাজার ৮০০ লাইটার জাহাজ পণ্য পরিবহনে নিয়োজিত রয়েছে। এ ছাড়া বাকি ৩০ ভাগ কন্টেইনার পণ্য টাগবোটের সাহায্যে সরাসরি আনা হয় বন্দরের জেটিতে। 
আমদানিকারকদের বরাতে জানা গেছে, লাইটার জাহাজনির্ভরতা কমলে জাহাজপ্রতি দৈনিক ১৫ থেকে ২০ হাজার ডলার সাশ্রয় হবে। তবে বাংলাদেশ লাইটার জাহাজ শ্রমিক ইউনিয়নের সহ-সভাপতি নবী আলম বলেন, আমরা তো খোলা পণ্য লাইটারিং করি। কন্টেইনার পণ্য নয়। আর বন্দরের জেটিতে যত বড় জাহাজই ভেড়ানো হোক না কেন এর প্রভাব আমাদের ওপর পড়বে না। 
তিনি বলেন, বন্দরের জেটি আছে এখন সর্বোচ্চ ২৫টি। আমদানিকারকদের লাইটারিং নির্ভরতা কমাতে গেলে বন্দরের কমপক্ষে ৩০০ জেটি লাগবে। এ রকম করতে গেলে ১ নম্বর জেটি থেকে কর্ণফুলী ব্রিজ পর্যন্ত জেটিই বানাতে হবে। এটা হলো শত বছর পরের কথা। কাজেই লাইটার জাহাজনির্ভরতা কমবে না। বলা যত সহজ বাস্তবটা অনেক ভিন্ন।
চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালক (পরিবহন) এনামুল করিম বলেন, বড় জাহাজ ভেড়ানোর সক্ষমতা অর্জন করায় চট্টগ্রাম বন্দর নতুন যুগে প্রবেশ করছে। আগে বেশি ড্রাফটের জাহাজ জেটিতে ভিড়তে পারত না বলে বহির্নোঙরে পণ্যগুলো লাইটারিং করতে হয়। এতে করে শিপিং এজেন্টদের বাড়তি অর্থ ব্যয় হতো। এখন সেটা আর হবে না।

Share this post

Join the conversation