07:13:01 pm
Tuesday, August 25

হতাশার মুহূর্তে করণীয় আমল

জীবনে আশা ও হতাশা দুটোই আসে। পৃথিবীতে কেউ বিরামহীন সুখ ভোগ করতে পারে না। দিনের পর রাত ও রাতের পর দিন যেমন পালাক্রমে আসতে থাকে, তেমনি আনন্দ-বেদনা, সুখ-দুঃখ, আশা-নিরাশা সবই জীবনের বাস্তবতা। সুন্দর এ পৃথিবীতে কেউ চিরসুখী নয়। কারণ দুনিয়া প্রকৃত সুখ ও ভোগের জায়গা নয়। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আমি মানুষকে কষ্টনির্ভররূপে সৃষ্টি করেছি’ (সুরা বালাদ : ৪)। কারও আনন্দ-শোক বা হাসি-কান্না তার আয়ত্তাধীন নয়। এগুলো আল্লাহর পক্ষ থেকে আসে। তিনি ইচ্ছে করলে মুহূর্তের মধ্যে ক্রন্দনকারীর মুখে হাসি ফোটাতে পারেন এবং হাস্যরতদের কাঁদিয়ে দিতে পারেন। জীবনের ভাঙা-গড়ার এ দর্শন যে উপলব্ধি করতে পারে, সাময়িক আনন্দকে সে চূড়ান্ত জ্ঞান করে না। সুখ ও ভোগে গা ভাসিয়ে দেয় না। আবার দুঃখের দিনে আশাহত হয় না। আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয় না।


চাকরিতে প্রমোশন হওয়ার কথা। আপনার হয়নি, কিন্তু জুনিয়র ও আপনার চেয়ে কম যোগ্য একজনের প্রমোশন হয়ে গেল। মন খারাপ করবেন না, হতাশ হবেন না। ব্যবসায় হঠাৎ বড় ধরনের ধস নামল, ভেঙে পড়বেন না। আল্লাহ পরীক্ষা করছেন। আল্লাহ তাকেই পরীক্ষা করেন, যাকে তিনি ভালোবাসেন। হাদিসে এসেছে, হজরত আনাস (রা.) বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই বড় পরীক্ষার ফলে বান্দা বড় পুরস্কার লাভ করে। আল্লাহ যখন কোনো কওমকে ভালোবাসেন, তখন তাদের পরীক্ষায় ফেলেন। যে ব্যক্তি সেই পরীক্ষায় সন্তুষ্ট থাকে, তার জন্য থাকে আল্লাহর সন্তুষ্টি। আর যে ব্যক্তি অসন্তুষ্ট হয়, তার জন্য থাকে আল্লাহর অসন্তুষ্টি’ (তিরমিজি : ২৩৯৬)। পৃথিবীতে বড় কিছু অর্জন করতে গেলে বড় কিছু বর্জন করতে হয়। বড় কোনো পুরস্কার পেতে গেলে বড় ধরনের পরীক্ষা দিতে হয়। প্রথম শ্রেণির পরীক্ষা যেমন সহজ হয়, পুরস্কারও তেমন ছোট হয়। দশম শ্রেণির পরীক্ষা যেমন কঠিন হয়, পুরস্কারও তেমন দামি ও বড় হয়। মুমিনের সবচেয়ে বড় পুরস্কার হলো জান্নাত লাভ, যা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন ব্যতীত সম্ভব নয়। জান্নাতের মহাপুরস্কার লাভ করতে গেলে দুনিয়াতে বড় বড় পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়।
দুনিয়ার জীবনে দুঃখ-কষ্ট আসবেই। মন খারাপ হবে। এ সময় ধৈর্য ধারণ করতে হবে। আল্লাহ ধৈর্যশীলদের পছন্দ করেন। আল্লাহ বলেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা ধৈর্য ধারণ করো এবং ধৈর্য ধারণের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা করো’ (সুরা আলে ইমরান : ২০০)। যারা ধৈর্য ধারণ করবে, মহান আল্লাহ তাদের পুরস্কৃত করবেন। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয় আমি তাদের ধৈর্যের কারণে আজ তাদের পুরস্কৃত করলাম; নিশ্চয় তারাই হলো সফলকাম’ (সুরা মুমিনুন : ১১১)। ভালো সময়, মন্দ সময় আসবে। এটা মানুষের জন্য পরীক্ষা। আল্লাহ বলেন, ‘আর ভালো ও মন্দ দ্বারা আমি তোমাদের পরীক্ষা করে থাকি এবং আমার কাছেই তোমাদের ফিরে আসতে হবে’ (সুরা আম্বিয়া : ৩৫)। মানুষের জন্য ধন-সম্পদ, সন্তান-সন্ততি দিয়ে বা নিয়েও পরীক্ষা করা হয়। আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি তো কেবল পরীক্ষাবিশেষ। আর আল্লাহর নিকটই মহান প্রতিদান’ (সুরা তাগাবুন : ১৫)। বিপদে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইতে হবে। বিপদ তিনি দেন। মন ভালো ও খারাপ তিনিই করেন। মনে এই দৃঢ় বিশ^াস রাখতে হবে। মানুষ হয়ে অন্য মানুষকে বিপদ দূরকারী ভাবা যাবে না। আল্লাহ না চাইলে কারও কিছু করার ক্ষমতা নেই।

বিপদ এলে কী করবেন। বিপদ, হতাশা, বিষণ্নতা ইত্যাদি যেকোনো মুহূর্তে মুমিনের প্রধান কর্তব্য আল্লাহকে স্মরণ করা, আল্লাহার কাছে অতীতের সব পাপ থেকে ক্ষমাপ্রার্থনা করা। বলা হয়, বিপদ ও হতাশা কাটানোর ওষুধ হচ্ছে ইস্তেগফার করা। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘অতঃপর আমি বলেছি, তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা চাও, তিনি তো মহাক্ষমাশীল। ফলে তিনি তোমাদের জন্য প্রচুর বৃষ্টিপাত করবেন, তোমাদের সমৃদ্ধ করবেন ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে’ (সুরা নুহ : ৭১)। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি নিয়মিত ইস্তেগফার করবে আল্লাহ তার সব সংকট থেকে উত্তরণের পথ বের করে দেবেন, সব দুশ্চিন্তা মিটিয়ে দেবেন এবং অকল্পনীয় উৎস থেকে তার রিজিকের সংস্থান করে দেবেন।’ (আবু দাউদ : ১৫২০)
আল্লাহর কাছে ইস্তেগফার করার পাশাপাশি রাসুলের ওপর দরুদ পাঠ করলেও আল্লাহ সহজ করেন। হাদিসে এসেছে, উবাই ইবনে কাব (রা.) বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল, আমি আপনার ওপর অধিক হারে দরুদ পাঠ করে থাকি। আমার সময়ের কতটুকু আপনার প্রতি দরুদ পাঠে ব্যয় করব? রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, তোমার যতটুকু ইচ্ছে। আমি বললাম, এক-চতুর্থাংশ সময়? তিনি বলেন, তোমার ইচ্ছে। কিন্তু যদি আরও বাড়াও তবে ভালো। আমি বললাম, অর্ধেক সময়? তিনি বলেন, তোমার যা ইচ্ছে; তবে আরও বৃদ্ধি করলে তা-ও ভালো। আমি বললাম, দুই-তৃতীয়াংশ সময়? তিনি বলেন, তোমার ইচ্ছে; তবে আরও বাড়ালে তা-ও ভালো। আমি বললাম, আমার সবটুকু সময় আপনার ওপর দরুদ পাঠে লাগাব? তিনি বলেন, তাহলে তো তোমার চিন্তামুক্তির জন্য তা যথেষ্ট হয়ে যাবে আর তোমার গুনাহ মাফ করা হবে। (তিরমিজি : ২৪৫৭)

চিন্তা ও পেরেশানির সময় রাসুলুল্লাহ (সা.) একটি বিশেষ দোয়া পড়তেন। দোয়াটি হলোÑ‘আল্লাহুম্মা ইন্নি আউজু বিকা মিনাল হাম্মি ওয়াল হাযানি, ওয়া আউজু বিকা মিনাল আজযি ওয়াল-কাসালি, ওয়া আউজু বিকা মিনাল বুখলি ওয়াল জুবনি, ওয়া আউজু বিকা মিন গালাবাতিদ দাইনি ওয়া কাহরির রিজাল।’ অর্থাৎ ‘হে আল্লাহ! নিশ্চয়ই আমি আপনার আশ্রয় চাই দুশ্চিন্তা ও দুঃখ থেকে, অপারগতা ও অলসতা থেকে, কৃপণতা ও ভীরুতা থেকে, ঋণের ভার ও মানুষদের দমন-পীড়ন থেকে।’ আনাস (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুল (সা.) চিন্তাযুক্ত অবস্থায় এই দোয়া পড়তেন (বুখারি : ২৮৯৩)। আল্লাহ সবাইকে বোঝার ও আমল করার তওফিক দিন।

Share this post

Join the conversation