দোটানায় চিকিৎসকরা
সরকারি হাসপাতালে প্রাইভেট প্র্যাকটিসের নীতিমালা প্রণয়ন কমিটির একাধিক সদস্যের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বেলা ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত চিকিৎসকদের এ কাজ করতে হবে। তবে প্রতিদিন নয়, সপ্তাহে হতে পারে দুয়েক দিন। রোগী দেখার জন্য আলাদা সম্মানীর ব্যবস্থা
ফার্মগেট, গ্রিন রোড, এলিফ্যান্ট রোডসহ ঢাকা শহরের বিভিন্ন স্থানের বেসরকারি ক্লিনিক বা বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসক দেখাতে ফি দিতে হয় এক হাজার থেকে দেড় হাজার টাকা। ওইসব প্রতিষ্ঠানে বেসরকারি চিকিৎসকদের পাশাপাশি সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকরাও পরামর্শ দিয়ে থাকেন। তবে এখন সরকারি হাসপাতালেই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের পরামর্শ নেওয়া যাবে। এ জন্য সম্মানী দিতে হবে ২০০-৪০০ টাকা। আগামী মার্চ মাস থেকেই সরকারি হাসপাতালে এ চিকিৎসাসেবা চালু করতে যাচ্ছে সরকার। এমনটাই জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। চিকিৎসকের ফি, পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রক্রিয়া কী হবে-এ নিয়ে হচ্ছে নীতিমালা।
বৈকালিক এ সেবা কতটা ফলপ্রসূ হবে এ নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, উদ্যোগটি ভালো হলেও এটি চালু করা বড় চ্যালেঞ্জ। দেশের চিকিৎসার অবকাঠামো পর্যাপ্ত নয়। চিকিৎসক, নার্স, টেকনিশিয়ানের অসংখ্য পদ খালি। সরকারি হাসপাতালে নিয়মিত রোগী ও তার স্বজনদের বসার জায়গা নেই, টয়লেট নেই। এটি বাস্তবায়ন করা না হলে সরকারি হাসপাতালের ভেতরের স্বাস্থ্যসেবা ঠিক রাখা কঠিন হবে। এ পরিস্থিতিতে নতুন করে অবকাঠামো ও প্যাথলজি সুবিধা এবং লোকবল না বাড়িয়ে এ ধরনের উদ্যোগে লাভ হবে না।
এদিকে সরকারি হাসপাতালে প্রাইভেট প্র্যাকটিস নিয়ে চিকিৎসকরাও দোটানায় আছেন। নিজের বাড়িতে, ব্যক্তি মালিকানাধীন ক্লিনিকে বা হাসপাতালে অথবা ওষুধের দোকানের এক পাশে সরকারি চিকিৎসকেরা সরকারি কাজের শেষে রোগী দেখেন, চিকিৎসাসেবা দেন। তবে সেটি সরকারি হাসপাতালে হবে কেমন করে? তারা কি সেখান থেকে টাকা পাবেন? তাদের এ কাজ কি বাধ্যতামূলক হবে? জনবল সংকট নিয়ে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালে দুপুর ২টা পর্যন্ত রোগী দেখেন। এরপর আবারও বৈকালিক সেবা কীভাবে দেবেন?
সরকারি হাসপাতালে প্রাইভেট প্র্যাকটিসের নীতিমালা প্রণয়ন কমিটির একাধিক সদস্যের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বেলা ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত চিকিৎসকদের এ কাজ করতে হবে। তবে প্রতিদিন নয়, সপ্তাহে হতে পারে দুয়েক দিন। রোগী দেখার জন্য আলাদা সম্মানীর ব্যবস্থা রাখা হবে। চিকিৎসকের মান অনুযায়ী এ সম্মানী হতে পারে ২০০-৪০০ টাকা।
রোববারের সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক জানিয়েছিলেন, এ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বাইরে চিকিৎসক দেখাতে একজন রোগীর যে খরচ হয়, তার চেয়ে কম খরচে ভালো সেবা মিলবে। রোগীরা কম পয়সায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দেখাতে পারবেন। ভর্তি রোগীরাও চিকিৎসা পাবেন। সরকারি হাসপাতালে একসঙ্গে অনেক চিকিৎসক পাওয়া যাবে। এতে সরকারি হাসপাতালে কোনো চিকিৎসককে জরুরি প্রয়োজন হলে তাকে পাওয়াটা সহজ হবে। সেই সঙ্গে সরকারি চিকিৎসকরা ধীরে ধীরে প্রাইভেট প্র্যাকটিসে নিরুৎসাহিত হবেন। প্রাথমিকভাবে ২০ জেলা ও ৫০ উপজেলা হাসপাতালের পাশাপাশি পাঁচটি মেডিকেল কলেজে পরীক্ষামূলক এ কার্যক্রম শুরু হবে।
২০১১ সাল থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) ২৬ বিভাগের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা কর্মঘণ্টা শেষে এ পদ্ধতিতে স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে আসছেন। এ জন্য দুপুর আড়াইটা থেকে বহির্বিভাগের বিশেষ সেবার টিকেট বিক্রি শুরু হয়। শুরুতে অনেকেই এর বিরোধিতা ও সমালোচনা করেছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নিয়ম মেনে জ্যেষ্ঠ চিকিৎসকরা বিকালে সংশ্লিষ্ট বিভাগেই রোগী দেখছেন। বিএসএমএমইউতে বেলা ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত অধ্যাপক ও সহযোগী অধ্যাপকদের বহির্বিভাগে পালা করে রোগী দেখতে হয়। রোগীপ্রতি ফি ২০০ টাকা। এর মধ্যে ১৩৫ টাকা পান চিকিৎসক, বাকি ৬৫ টাকা পান কর্মচারীরা। বারডেম হাসপাতালও একই পদ্ধতিতে চিকিৎসাসেবা দিচ্ছে।
চিকিৎসকরা বলছেন, শুধু বিএসএমএমইউর মডেল দেখে কোনো মূল্যায়ন ছাড়া সারা দেশে এ প্রকল্প বাস্তবায়নের যৌক্তিকতা নেই। সাধারণত সুচিকিৎসার জন্য একজন চিকিৎসকের বিপরীতে তিনজন নার্স, পাঁচজন টেকনোলজিস্টের প্রয়োজন হয়। দেশে এ জনবল নেই বললেই চলে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে প্রচুর রোগী। বারান্দায়ও রোগী রেখে চিকিৎসা দিতে হয়।
বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনোস্টিক সেন্টার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে ২২ হাজার হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনোস্টিক সেন্টার রয়েছে। তবু প্রতি বছর অন্তত পাঁচ লাখ মানুষ চিকিৎসা নিতে বিদেশে যান। সরকারি হাসপাতালে মানসম্পন্ন চিকিৎসার অভাব এবং বেসরকারি হাসপাতালে অত্যধিক খরচের কারণে বিদেশে চিকিৎসা নিতে যাওয়ার প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে।
এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক ও ইমেরিটাস অধ্যাপক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ সময়ের আলোকে বলেন, সরকারি হাসপাতালে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের চেম্বারের ভাবনা সরকারের ভালো উদ্যোগ। তবে দেশের চিকিৎসাব্যবস্থার অবকাঠামো পর্যাপ্ত নয়। রাজধানীর বাইরে উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজে চিকিৎসক, নার্স, টেকনিশিয়ানের পদ খালি। এ দেশে প্রচুর মানুষ, প্রচুর রোগী। হাসপাতালগুলোতে বারান্দায় রোগী রাখতে হয়। অবকাঠামো ঠিক না করে এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হলে পুরো চিকিৎসাসেবা ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
তিনি বলেন, বিএসএমএমইউ, বারডেম, হার্ট ফাউন্ডেশনে এ ধরনের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। সেখানে সক্ষমতা আছে। অন্যান্য হাসপাতালে নিয়মিত রোগী ও তার স্বজনদের বসার জায়গা নেই। প্রস্রাব-পায়খানা করার ব্যবস্থা নেই। নতুন করে অবকাঠামো ও প্যাথলজি সুবিধা এবং লোকবল না বাড়িয়ে এ ধরনের উদ্যোগে লাভ হবে না। অধ্যাপক আব্দুল্লাহ বলেন, প্রচুর লোক বিদেশে চিকিৎসা করতে যাচ্ছে। রাগ করে আরও বেশি মানুষ চিকিৎসার জন্য বিদেশ যাবে।
নীতিমালা প্রণয়ন কমিটির প্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমদ সময়ের আলোকে বলেন, এটা চিকিৎসকদের জন্য বাধ্যতামূলক নয়। না করতে চাইলে করবেন না। সপ্তাহে এক দিন চিকিৎসকরা সময় দেবেন। বেলা ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত চিকিৎসকরা চিকিৎসাসেবা দেবেন। নিয়ম হলে কেন করবেন না। নীতিমালা করা হচ্ছে। রোগীরা বিশেষায়িত চিকিৎসা পাবে। বিএসএমএমইউকে পাইলট হিসেবে ধরার কথা বলা হয়েছে। বিএসএমএমইউতে চিকিৎসকরা যেভাবে রোগী দেখেন, সেভাবেই প্রস্তাব দেওয়া হবে। যে হাসপাতালে রোগী দেখবেন, সেখানেই পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা থাকবে।
নীতিমালা প্রস্তুত হতে দুই থেকে তিন সপ্তাহ লাগবে জানিয়ে বিএসএমএমইউর উপাচার্য আরও বলেন, সরকারের এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে অবশ্যই অবকাঠামো ও জনবল সংকট নিরসন এবং আলাদা সম্মানীর ব্যবস্থা রাখা হবে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেনিন চৌধুরী সময়ের আলোকে বলেন, যেকোনো দেশের সরকারের দায়িত্ব তার জনগণের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা। বর্তমানে সরকারি এবং বেসরকারিভাবে মানুষকে স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালিত হয় জনগণের অর্থে। সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসকদের দায়িত্ব হচ্ছে সাধারণ মানুষকে সেবা দেওয়া। এখন সরকার যদি মনে করে মানুষকে আরও ভালো সেবা দিতে হবে, তাহলে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসকদের ওভার টাইম কিংবা অতিরিক্ত লোকবল নিয়োগ দিয়ে বৈকালিক শিফটে স্বাস্থ্যসেবা শুরু করতে পারে। এতে মানুষ উপকৃত হবে।
তিনি বলেন, সকালে জনগণের টাকায় সরকারি সেবা দেওয়া আবার বিকালে একই জায়গায় প্রাইভেট প্র্যাকটিস করা কোনোভাবেই মানানসই বা গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ সরকারি ফ্যাসিলিটি নিয়ে একই স্থানে সেবা দিতে পারে না। এর মধ্য দিয়ে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী দরিদ্র মানুষ যারা সকালে সেবা নেবে আর মধ্যবিত্ত এবং অর্থবান মানুষেরা বিকালে সেবা নেবে। এটা সেবার মানের ক্ষেত্রে একটা বৈষম্য সৃষ্টি হবে। স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে।
এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বলেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষকে এবং বেসরকারি হাসপাতালগুলো প্রায় ৬০ শতাংশ মানুষকে সেবা দিয়ে থাকে। আমরা মনে করি, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে আইনসঙ্গতভাবে জনকল্যাণমুখী ও মানবমুখী হয়ে মানুষকে সেবা দিতে হবে। এ জন্য একটি নীতিমালা প্রণয়নের দাবি জানান তিনি।
বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনোস্টিক সেন্টার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি অধ্যাপক ডা. মনিরুজ্জামান ভূঁইয়া সময়ের আলোকে বলেন, সরকারের যেকোনো ভালো উদ্যোগকে আমরা স্বাগত জানাই। তবে বিষয়টি যেহেতু সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকদের জন্য, তাই আমাদের দিক থেকে কোনো সমস্যা নেই। আমরা তো বেসরকারিভাবে ২৪ ঘণ্টা স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে যাচ্ছি।
