রোজার পণ্য আমদানি বাড়লেও কাটছে না সংকট
আসন্ন রোজার মাসকে ঘিরে পণ্য আমদানি চলছে এখন। ডলার সংকট এখনও না কাটলেও বিগত কয়েক দিনে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে পণ্য আমদানি কিছুটা বেড়েছে। তবে পণ্য আমদানি বাড়লেও ভোগ্যপণ্যের বাজারে সংকট কাটেনি এখনও।
দেশের শীর্ষ পাইকারি বাজার চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জেও পণ্যের মজুদ বেড়েছে, তবে সেখানকার ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাজারে এখনও দাম কমেনি কোনো পণ্যের।
ব্যবসায়ী সূত্র বলছে, ডলার সংকটের কথা বললেও পণ্য আমদানি থেমে নেই। অর্থাৎ ব্যবসায়ীরা, বিশেষ করে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো পণ্য মজুদ বাড়ালেও সংকটের কথা বলে পণ্যমূল্য বাড়িয়ে বেশি মুনাফা তুলে নিতে চায়।
এদিকে চট্টগ্রাম বন্দরের তথ্য বলছে, বিগত কয়েক দিন ডলার সংকটের কারণে যেসব পণ্য খালাস করা যাচ্ছিল না, সেগুলোও প্রায় খালাস হয়ে গেছে।
এমন তথ্য জানিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের উপ-পরিচালক (নিরাপত্তা/অপারেশন) মেজর মো. ওয়াহিদুল হক বুধবার সময়ের আলোকে বলেন, বিগত কয়েক দিন বন্দরে যেসব কন্টেইনারভর্তি জাহাজ ছিল সেগুলো খালাস হয়ে গেছে। এখন প্রতিদিন ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৭০০ কন্টেইনার খালাস হচ্ছে বন্দরে। এখন এখানে কোনো কন্টেইনার জটও নেই। যেসব খাদ্যপণ্যবাহী জাহাজ ডলার সংকটের কারণে আটকে ছিল সেগুলোও খালাস হয়েছে কি না- এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘খাদ্যপণ্যবাহী ও অন্যান্য পণ্যবাহী সব ধরনের জাহাজই খালাস হয়ে গেছে। বন্দরে এখন আর কোনো সংকট নেই।’
চট্টগ্রামের প্রধান পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এখানেও গত দুই-তিন মাসের চেয়ে এখন খাদ্যপণ্যের সরবরাহ বেড়েছে।
খাতুনগঞ্জ ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি সগির আহমেদ বুধবার সময়ের আলোকে বলেন, বিগত কয়েক মাসে খাতুনগঞ্জে চিনি এবং ভোজ্যতেলের সংকট ছিল সবচেয়ে বেশি। বিশেষ করে চিনির মিল তো খুবই কম। এখন সে অবস্থার অনেক উন্নতি ঘটেছে। এখানকার চিনি ব্যবসায়ীদের মোকামে এখন চিনি আসছে। তবে চিনির দাম সেভাবে কমেনি। কারণ মিল থেকে দাম কমানো হচ্ছে না। চিনির মূল্য কমা বা বাড়ানোর সম্পূর্ণ এখতিয়ার আমদানিকারক ও মিল মালিকদের। তারা না কমালে বাজারেও দাম কমার সুযোগ নেই।
তিনি আরও বলেন, বাজারে এখন মসুর ডালসহ সব ধরনের ডাল, ছোলাসহ আরও কিছু পণ্যের পর্যাপ্ত সরবরাহ রয়েছে। এ জন্য খাতুনগঞ্জে ডালের দাম কেজিতে ৫-৭ টাকা কমেছেও। আশা করছি আরও কিছুটা কমবে।
এদিকে দ্রব্যমূল্য-সংক্রান্ত জাতীয় টাস্কফোর্সের প্রতিবেদন তথ্যও বলছে, অপরিশোধিত চিনি ও পাম তেলসহ আরও কিছু পণ্যের আমদানি হয়েছে বেশ ভালোই। রমজান ঘিরে দেশে ভোজ্যতেল, চিনি, ছোলা, মসুর ডাল, পেঁয়াজ ও খেজুরের চাহিদা অন্যান্য মাসের চেয়ে দ্বিগুণ থাকে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশে রমজান মাসে ভোজ্যতেলের চাহিদা ৩ লাখ টন। গত জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে পণ্যটি আমদানি হয়েছে ৯ লাখ ৮২ হাজার টন। রমজানে চিনির চাহিদা ৩ লাখ টন। গত জুলাই-ডিসেম্বর আমদানি হয়েছে ৬ লাখ ৮৫ হাজার টন। ছোলার চাহিদা ১ লাখ টন। গত জুলাই-ডিসেম্বর পর্যন্ত আমদানি হয়েছে ৫৩ হাজার ৪৭৬ টন। খেজুরের চাহিদা ৫০ হাজার টন। গত জুলাই-ডিসেম্বর পর্যন্ত আমদানি হয়েছে ১১ হাজার ৭৭৩ টন। রমজানে মসুর ডালের চাহিদা ১ লাখ টন। জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত আমদানি হয়েছে ১ লাখ ৯৮ হাজার টন। রমজানে পেঁয়াজের চাহিদা থাকে ৪ লাখ টন। আর জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত আমদানি হয়েছে ৩ লাখ ৭৬ হাজার টন। অর্থাৎ ডিসেম্বর পর্যন্ত ভোজ্যতেল, চিনি, মসুর ডালের আমদানি সন্তোষজনক। তবে কিছুটা ঘাটতি রয়েছে ছোলা, খেজুর আর পেঁয়াজ আমদানিতে।
চট্টগ্রামের অন্যতম শীর্ষ ব্যবসায়ী ও চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি মাহবুবুল আলমও মনে করছেন, রোজা ঘিরে পণ্য আমদানি পরিস্থিতির অনেকটাই উন্নতি ঘটেছে। তবে পণ্য আমদানিতে ব্যবসায়ীরা চাহিদামতো ডলার এখনও পাচ্ছেন না বলে জানান তিনি।
সময়ের আলোকে তিনি বলেন, খাতুনগঞ্জের মোকামগুলোতে এখন পণ্যের সরবরাহ বেড়েছে। বন্দর দিয়েও পণ্য খালাস বেড়েছে। আমার জানা তথ্যমতে, রোজার মাসের জন্য যেসব পণ্যের চাহিদা রয়েছে তার পর্যাপ্ত আমদানি করা হচ্ছে। আমি মনে করি, রোজার আগ দিয়ে বা রোজার শুরুর পর যদি দুটি বিষয় ঠিক রাখা যায় তাহলে বাজারে কোনো সংকট হবে না। সে দুটি বিষয় হচ্ছে প্রতি বছর রোজা শুরুর আগে ক্রেতারা যেমন হুমড়ি খেয়ে পড়ে পণ্য কিনতে সেটি যেন না করা হয়। অর্থাৎ একই সঙ্গে একেক ক্রেতা যেন ১০-১৫ কেজি করে পণ্য না কেনে। এভাবে কিনলে বাজারে পণ্য সংকট তৈরি হবে। আরেকটি বিষয় হচ্ছে যেসব মিল মালিক ও আমদানিকারক পণ্য আমদানি করছেন, তারা যেন পণ্যের অবৈধ মজুদ না করেন। পণ্য মজুদ রেখে তারা যেন বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি না করেন। সুতরাং বাজারে যদি পণ্যের সাপ্লাই চেইন ঠিক রাখা যায় তাহলে কোনো সংকট হবে না রোজায়। সরকারকে এ বিষয়টি কঠোরভাবে মনিটরিং করতে হবে। যদিও কিছু অসাধু ব্যবসায়ী কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করেই প্রতি বছর বাজার সিন্ডিকেট তৈরি করে প্রচুর মুনাফা করে। আমি তাদের ব্যবসায়ী বলতে চাই না, তারা আসলে ঠকবাজ। তাদের ব্যাপারেও সরকারকে সতর্ক থাকতে হবে।
এদিকে কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহ-সভাপতি এসএম নাজের হোসেন সময়ের আলোকে বলেন, ‘আমরাও খোঁজ নিচ্ছি বাজারে। আমাদের জানা মতেও বাজারে পণ্যের সরবরাহ বেড়েছে, কিন্তু দাম সেভাবে কমেনি। যদিও চিনির দাম সামান্য কমেছে, কিন্তু সরবরাহ বাড়ায় যে হারে কমার কথা ছিল সে হারে কমেনি। খাতুনগঞ্জে কিন্তু পণ্যের কোনো অভাব নেই। তবে দাম কমছে না। আসলে ব্যবসায়ীরা ডলার সংকটের কথা বললেও ভেতরে ভেতরে ঠিকই অনেক পণ্য আমদানি করেছে। কিন্তু ডলার সংকটের কথা বলে তারা দাম বাড়িয়ে ফায়দা নিতে চায়, অস্বাভাবিক মুনাফা করতে চায়। সরকারি সংস্থাগুলোকে এ ব্যাপারে তৎপর হতে হবে।’

Join the conversation