08:32:39 pm
Tuesday, August 25

সূর্যমুখী জীবন

উল্টানো কাঁসার থালার মতো সূর্যটা ডুবে যাচ্ছে ধনুক আকৃতির কর্ণফুলীর অতল জলে। আকাশে ছড়িয়ে যাচ্ছে সারাদিন আলো বিলিয়ে ক্লান্ত হয়ে যাওয়া সূর্যের ম্রিয়মাণ রক্তিম আভা, টলটলে জলে সেই প্রতিচ্ছবির দিকে তাকিয়ে ষোড়শী পুষ্পকুন্তলা তার নিয়মিত ভাবনার জট খুলতে থাকে। প্রতিদিনের মতো আজও এই সূর্যডোবা ক্ষণে তার মনে শুধু একটি ভাবনাই দোল খায়। আরাকানের চোখ ধাঁধানো সুন্দরী রাজকুমারী প্রেমে পড়েছিল চট্টগ্রামের এক আদিবাসী রাজপুত্রের। কোনো এক চাঁদনি রাতে জোছনা গায়ে মেখে তারা বের হয় নৌবিহারে। শুক্লপক্ষের চাঁদকে সাক্ষী রেখে রাজপুত্র একটি নাম না-জানা ফুল কানে গুঁজে দেয় রাজকন্যার। আবেগে ভাসতে থাকা অসতর্ক রাজকুমারীর কান থেকে ফুলটি খুলে নীরবে পড়ে যায় নদীর জলে। ছলাৎ ছলাৎ নাও বাওয়ার শব্দ ছাপিয়ে শোনা যায় ফুপিয়ে ওঠা রাজকন্যার কান্না, এ যে তার প্রেমিকের দেওয়া উপহার! রাজপুত্র কিছু বুঝে ওঠার আগেই নদীতে ঝাঁপ দিয়ে ফুলটি তোলার চেষ্টা করে রাজকন্যা এবং প্রবল স্রোতের তোড়ে ভেসে যায় অজানায়। প্রেমিকের চোখে তখন স্বপ্নভঙ্গের বেদনা, প্রাণপ্রিয় প্রেমিকাকে উদ্ধারের জন্য নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ে রাজপুত্র। আপ্রাণ চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে নদীর জলে দেয় আত্মাহুতি। সেই থেকে নাকি এই নদীর নাম কর্ণফুলী। প্রতিদিন সন্ধ্যা নামার আগে নদীর জলে পা ডুবিয়ে এই একটি ভাবনা নিয়ে খেলা করে পুষ্পকুন্তলা, পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তি সাজায়, ভালোবাসার আবেগ তাকেও আষ্টেপৃষ্ঠে জড়ায়, এমন একজন ভালোবাসার মানুষকে নিজের জীবনেও ক্রমাগত হাতড়ে বেড়ায়। 

‘সূর্যডোবা দেখতে হবে না আর, জলজ্যান্ত সূর্য এসে গেছে তোর জীবনে। সইয়ের উচ্চারণে ভাবনায় ছেদ পড়ে পুষ্পের। ’ 
‘সূর্য!’ 
‘নোয়াপাড়ার সূর্যসেনের জ্যাঠতুতো দাদা তোর সঙ্গে তার ভাইয়ের বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এসেছেন।’
‘বাব্বা, মনে হচ্ছে আনন্দটা তোরই বেশি হচ্ছে সই?’ 


‘হবেই তো, প্রতিদিন অস্ত যাওয়া সূর্যের দিকে তুই চেয়ে থাকিস, এখন গনগনে জ্বলন্ত সূর্য আসছে তোর জীবনে, এর চেয়ে আনন্দের আর কী হতে পারে! কিন্তু সই, তোর সূর্যের ডাকনাম নাকি কালু! যে সূর্যের আলোয় চোখ পুড়ে যায়, তার নামের সঙ্গে অন্ধকার জড়িয়ে দিল কে! ’ ‘এটা নিয়ে তুই গভীর ভাবনায় ডুব দে।’ ‘বিয়ের আসরে সূর্যদেবকে এই প্রশ্নটি আমি করবই।’ 


বিয়ের প্রস্তাবে সম্মতি জানিয়ে নগেন্দ্রনাথ দত্ত শুরু করেছেন মেয়ের বিয়ের আয়োজন। পুষ্পের মনে উৎকণ্ঠা পাক খায়- তার স্বামীটিও কি সেই রাজপুত্রের মতো ভালোবেসে আগলে রাখবে তাকে? স্বামীর ভালোবাসার পারদের ওঠানামা টের পাওয়ার আগেই নিজের বুকের বাম পাশে ভালোবাসার আসনটি তার জন্য পাকাপোক্ত হয়ে যায়। ছাদনাতলায় কী এক অদৃশ্য কারণে লজ্জানত পুষ্পকুন্তলার বুক দুরুদুরু কেঁপে ওঠে বারবার, অগ্নিদেবতাকে সাক্ষী রেখে সূর্যসেন উচ্চারণ করে ‘যদিদং হৃদয়ং মম, তদস্তু হৃদয়ং তব।’ 


বিপ্লবী স্বামীর ঘরের কোনায় কোনায় বই, মাঝখানে চার পায়ে দাঁড়িয়ে থাকা সেগুন কাঠের তক্তপোষে করা হয়েছে ফুলশয্যার আয়োজন। নববধূ স্বামীর ঘরে ঢোকার অপেক্ষায় প্রহর গুনেই চলেছে, কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে বেড়ে গেছে ফুল এবং বইয়ের অন্তর্দ্বন্দ্ব। সূর্যের গোলাকার মুখে পড়েছে গ্রহণের ছায়া। ঘরের বাইরে অনবরত পায়চারি করেই চলেছে সে। 
‘মেজোমশায়, ঘরে যাও, পুষ্প তোমার জন্য অপেক্ষা করছে।’


বউদির এ কথায় সূর্যের অস্থিরতা বাড়ে। 
ঘরের দিকে পা বাড়ায় সূর্য।


‘আমি জানি, তুমি অনেক আশা নিয়ে এ ঘরে পা দিয়েছ। কিন্তু বিয়েতে আমার একেবারেই মত ছিল না। দাদা এবং আত্মীয়স্বজনের চাপে আমি বাধ্য হয়েছি। আমি একজন বিপ্লবী। বিপ্লবীকে হতে হয় সন্ন্যাসীর মতো। তার জীবনে ক্রোধ, লোভ এবং কাম থাকলে চলে না। পুষ্প, দেশকে ভালোবেসে একজন বিপ্লবীর স্ত্রী হিসেবে এ জীবন তোমাকে মেনে নিতে হবে।


পুষ্পকুন্তলা ঘোমটায় আড়াল করে চোখের জল। স্বামীর কথায় তার বুকের বা দিকটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে ওঠে। কিন্তু সেই চোখের জল অথবা বুকের ব্যথা অনুভবে আসে না সূর্যের। ফুলশয্যার রাতেই গ্রাম ছেড়ে শহরে পা বাড়ায় সূর্য। 


ফাঁকা ঘরে একলা দিন অথবা রাতযাপনে অভ্যস্ত হয়ে উঠতে শুরু করে পুষ্প। কোনো এক শীতের সকালে স্বামীর ডাকে ঘুম ভাঙবে তার, আদরমাখা গলায় সে বলবে, ‘এক কাপ চা করো তো পুষ্প’ অথবা বসন্তের বিকালে এক থোকা জারুল ফুল এনে গলা জড়িয়ে ধরবে ‘আমি জানি বেগুনি রং তোমার খুব পছন্দের’- পুষ্পের মনে স্থির বিশ্বাস জন্মায়, একদিন সূর্য ফিরবেই। চন্দ্রনাথ সেনের সন্তান টোনাকে নিজের ভাবনায় জমে থাকা কর্ণফুলীর গল্প শুনিয়ে ঘুম পাড়ায়। 


‘দিদি, আমি কি তোমার মেজোমশায়ের কাজে কোনো সাহায্যই করতে পারতাম না?’ 
পুষ্পের এমন প্রশ্নে সূর্যের বউদির চোখে এক ফোঁটা জল এসে পড়ে, সেই জল আঁচলের ভাঁজে লুকাতে গিয়ে গরম শর্ষের তেলে দেওয়া শুকনো মরিচ এবং পাঁচফোড়ন পুড়ে কয়লা হয়ে যায়। ধোঁয়া এবং ঝাঁজে ভরা রান্নাঘর থেকে কাশতে কাশতে মিনমিন করে বলে, ‘দেখলি পুষ্প, কী কাজটাই না করলাম! ঝাঁজে চোখে জল এসে যাচ্ছে। আচ্ছা, তুই সূর্যকে চিঠি লিখিস না কেন? চিঠি পেলে দেখবি একদিন ছুটে চলে আসবে। ’
একটানা ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাকে মাথার ভেতর প্রতি রাতে যে অস্থিরতা হয় এই রাতে আর তা টের পায় না পুষ্প। টিমটিমে লণ্ঠনের আলোয় পুষ্পকুন্তলা স্বামীকে চিঠি লিখতে বসে। 


‘আমি দেশের জন্য কাজ করতে চাই। স্ত্রী কি ছাত্রী হতে পারবে না?’
স্ত্রীর চিঠির উত্তর দেয় না সূর্য, তবে সে বুঝতে পারে পুষ্পকুন্তলার একলা একঘেয়ে সময় কাটতে চায় না। স্ত্রীর জন্য কিছু গল্প-উপন্যাসের বই পাঠিয়ে দেয় সে। 


স্বামীর পাঠানো বই পড়তে শুরু করে পুষ্প। কিন্তু কেন জানি কিছুতেই মনটা শান্ত হয় না। বনের মধ্যে একটা হিজল গাছের সঙ্গে তার বন্ধুত্ব জমে ওঠে, প্রতিদিন হিজলের ছায়ায় গিয়ে বসে ভাবে বিয়ের আসরে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখা সূর্যের তেজদীপ্ত মুখ। কখনোবা ‘বউ কথা কও’ পাখির সঙ্গে অকারণ গলা মেলায়, আমের মুকুলের ম-ম গন্ধ তাকে নেশাতুর করে দেয়। 


‘পুষ্প, তুই যে এমন বনে-বাদাড়ে ঘুরিস, একদিন কিন্তু কঠিন অসুখে পড়বি। ’ 
পুষ্প যখন স্বাধীনতার সবটুকু রস নিংড়ে নিংড়ে নিতে থাকে সূর্য তখন স্বাধীনতার খোঁজে গোটা ভারতে বিপ্লব ছড়িয়ে দিতে চায়। একদিন গোপন আস্তানা থেকে গ্রেফতার করা হয় তাকে। পাঠিয়ে দেওয়া হয় জেলে। মন পোড়ে পুষ্পের জন্য। অতঃপর পুষ্পের চিঠি আসে। তবে কাঁপা কাঁপা হরফে লেখা এই চিঠি সূর্যের বুকের কাঁপন বাড়ায়। 
‘আমি যখন থাকব না, তখন টোনার দিকে একটু লক্ষ রেখো।’ 


সূর্যের বউদির ভবিষ্যদ্বাণী মিলে যায়, নিজের প্রতি চরম অবহেলা এবং অযত্নে টাইফয়েড বাসা বাঁধে পুষ্পের শরীরে। 
স্ত্রীর অসুস্থতার খবর পৌঁছে যায় জেলে, সূর্যের মন পুষ্পকুন্তলাকে দেখার জন্য ছটফট শুরু করে। জেল থেকে এক মাসের জন্য ছাড়া পায় সে। পুলিশি পাহারায় নিয়ে আসা হলো চট্টগ্রাম। 
‘পুষ্প তাকিয়ে দেখো, আমি এসেছি।’
সূর্যসেনের গলার আওয়াজে চোখ মেলে তাকায় পুষ্পকুন্তলা, তার ঠোঁটে খেলে যায় মৃদু হাসির রেখা। 
যে মুখ একটিবার দেখার জন্য এতদিন অপেক্ষা করেছে পুষ্প, সেই মুখে চেয়ে পলক পড়ে না চোখের। এমন গনগনে জ্বলন্ত সূর্যের দিকে পুষ্পের মতো করে আর কেউ তাকাতে পারে না। 
এ যে তার একান্ত নিজস্ব এক নক্ষত্র! পুষ্পকুন্তলার দুটি চোখ জলভরা দিঘির মতো কানায় কানায় ভরে ওঠে। তবু এই জল উছলে গড়িয়ে পড়ে না। 
মৃত মানুষের চোখের জল যে গাল বেয়ে নামতে পারে না।

Share this post

Join the conversation