03:23:25 pm
Sunday, June 21

অপচিকিৎসায় মৃত্যুতেও বহাল তবিয়তে বাণিজ্য

চানখাঁরপুলের নাজিম উদ্দিন রোড এলাকায় ঢাকা জেনারেল হাসপাতাল ও ডায়াগনোস্টিক সেন্টার। নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর দুই কক্ষের এ চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানটিকে স্পেশালাইজড হাসপাতাল হিসেবে ঘোষণা দিয়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মাধ্যমে চিকিৎসাসেবা প্রদানের গ্যারান্টি দেওয়া হচ্ছে। মেডিসিন, সার্জারি, গাইনি, অর্থোপেডিক, ইউরোলজি, নিউরোসার্জারি, শিশু বিভাগসহ সব ধরনের অপারেশন করা হয় বলে

চানখাঁরপুলের নাজিম উদ্দিন রোড এলাকায় ঢাকা জেনারেল হাসপাতাল ও ডায়াগনোস্টিক সেন্টার। নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর দুই কক্ষের এ চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানটিকে স্পেশালাইজড হাসপাতাল হিসেবে ঘোষণা দিয়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মাধ্যমে চিকিৎসাসেবা প্রদানের গ্যারান্টি দেওয়া হচ্ছে। মেডিসিন, সার্জারি, গাইনি, অর্থোপেডিক, ইউরোলজি, নিউরোসার্জারি, শিশু বিভাগসহ সব ধরনের অপারেশন করা হয় বলে প্রতিষ্ঠানটির উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু সেখানে কোনো অপারেশন থিয়েটার নেই, নিজস্ব কোনো চিকিৎসকও নেই। লাইসেন্স ছাড়াই চিকিৎসার নামে অপচিকিৎসা চলছে এখানে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের অভিযানে দুই দফা বন্ধ করা হয় প্রতিষ্ঠানটি। কিছু দিন বন্ধ রেখে আবারও চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে এখানে। পাশেই আহমেদ স্পেশালাইজড হাসপাতাল, সাইনবোর্ড বদলে সেখানেও চলছে ‘বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের’ স্বাস্থ্যসেবা। অভিযানে বন্ধ হওয়ার আগে হাসপাতালটির নাম ছিল আইউ স্পেশালাইজড হাসপাতাল। 

শুধু এ দুটি হাসপাতাল নয়, চানখাঁরপুল থেকে আজিমপুর ১০০ গজের মধ্যে এমন অর্ধ শতাধিক ক্লিনিক ও ডায়াগনোস্টিক সেন্টার আছে। নেই রোগ নির্ণয়ের মানসম্মত যন্ত্রপাতি, অপারেশন থিয়েটার, পরীক্ষাগার, প্রশিক্ষিত সেবিকা ও ল্যাব টেকনোলজিস্ট। নাক, কান ও গলা অ্যান্ড সার্জনসহ বিভিন্ন রোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সাইনবোর্ড টাঙানো থাকলেও নিয়মিত রোগী দেখতে বসেন না তারা। ধার করা পার্টটাইম চিকিৎসক দিয়ে চলছে জটিল অপারেশনসহ নানা চিকিৎসা। ছোট খুপরির মতো কয়েকটি কক্ষ ভাড়া নিয়ে চলছে হাসপাতালের কার্যক্রম। এর অধিকাংশ ভবনই জরাজীর্ণ পুরোনো। কিছু ভবনে নিচ তলায় ভাঙ্গারি ও পুরোনো কাগজের গুদাম, ওপরে বিভিন্ন কলকারখানা কিংবা ট্রান্সপোর্টের এজেন্সি রয়েছে। এমনকি রোগী ওঠানামার সিঁড়িগুলোও সরু। 

গত দুই দিন রাজধানীর এ এলাকা ঘুরে এমন চিত্রই দেখা গেছে। অনুমোদনহীন এসব হাসপাতালে চিকিৎসার নামে ব্যবসা, প্রতারণা, রোগী ভোগান্তির অভিযোগ উঠছে হরহামেশাই। রমরমা ব্যবসার কারণে রাজধানীর বাইরে বিভাগীয় শহর থেকে শুরু করে উপজেলাগুলোতেও এখন রোগ নির্ণয় কেন্দ্রের ব্যাপক বিস্তৃতি ঘটেছে। স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান চালুর আগে স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে অনুমোদন নিতে হয়। এ জন্য একগুচ্ছ নিয়মকানুন মেনে যোগ্য হতে হয়। থাকতে হয় স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, নার্স, টেকনোলজিস্ট, যন্ত্রপাতি। কিন্তু সিটি করপোরেশন, পৌরসভা থেকে ট্রেড লাইসেন্স নিয়েই চালু করা হয় ক্লিনিক ও ডায়াগনোস্টিক সেন্টার। ক্লিনিক কিংবা ডায়াগনোস্টিক সেন্টার চালুর জন্য স্বাস্থ্য বিভাগের লাইসেন্স, পরিবেশ অধিদফতরের ছাড়পত্র নিতে হয়। প্রতি অর্থবছর বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের নিবন্ধন নবায়ন করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু শুধু ট্রেড লাইসেন্সে নিয়েই চালানো হচ্ছ ক্লিনিক ও ডায়াগনোস্টিক সেন্টার। 

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, লোক দেখানো এসব অভিযান বেশিদিন চলমান থাকে না। অভিযান কয়েক দিন চলার পর আগের মতোই বন্ধ হয়ে যায়। তাই বেসরকারি খাতে স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া নিয়ে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার যেমন অভাব রয়েছে তেমনি রয়েছে মনিটরিংয়ের অভাব। এসব নিয়ন্ত্রণ আনতে সব কিছু ঢেলে সাজানোর পরামর্শ দেন তারা। 

গত বছর দেশব্যাপী দুই দফা অভিযান চালিয়েছিল স্বাস্থ্য অধিদফতর। মে ও আগস্টে চালানো অভিযানে ১ হাজার ৮৯৫টি প্রতিষ্ঠান বন্ধ করা হয়েছিল। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানই ঢাকার বাইরের। পরে কিছু প্রতিষ্ঠান নিবন্ধনের আওতায় এলেও বড় অংশ নিয়মবহির্ভূতভাবেই চলছে। ঢাকা, খুলনা, কুমিল্লা, বগুড়াসহ অন্তত ১৫ জেলায় খোঁজ নিয়ে অবৈধ প্রতিষ্ঠান চালু রাখার তথ্য মিলেছে। ব্যতিক্রম শুধু চট্টগ্রাম। সেখানে বন্ধ করা কোনো প্রতিষ্ঠান শর্ত পূরণ না করে চালু করতে পারেনি। 

স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বৈধ-অবৈধ মিলিয়ে বেসরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান ২২ হাজারের মতো। গত ২৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত নিবন্ধনের জন্য আবেদন করেছে ১৮ হাজার ৭৩৩টি। এর মধ্যে নিবন্ধিত ১৩ হাজার ৬৯৬টি। সব শর্ত পূরণ না করাসহ নানা জটিলতায় নিবন্ধনের অপেক্ষায় ৫ হাজার ৩৭টি প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে মারাত্মক ত্রুটিপূর্ণ আবেদনই ২ হাজারের মতো। প্রায় ৩ হাজার প্রতিষ্ঠান আবেদনই করেনি। 
স্বাস্থ্যসেবায় অবকাঠাগত অনেক উন্নয়ন হলে সাধারণ মানুষ এখনও কাক্সিক্ষত সেবা পাচ্ছে না। এর কারণ হিসেবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী সময়ের আলোকে বলেন, বেসরকারি খাতে চিকিৎসার মান কেমন হবে তার জন্য পর্যবেক্ষণ করা জরুরি। যেমন চিকিৎসার মান কেমন, লজিস্টিক সাপোর্ট এবং অন্য জনবল কতটুকু আছে এমনকি সেবামূল্য কেমন হবে তা সরকারের পক্ষ থেকে নির্ধারণ করা দরকার, যা করা হয়নি। ফলে এই জায়গায় তদারকি বাড়াতে হবে।

বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনোস্টিক সেন্টার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি অধ্যাপক ডা. মনিরুজ্জামান ভূইয়া সময়ের আলোকে বলেন, গত বছর আমাদের লাইসেন্সপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের সদস্য সংখ্যা ছিল ১১ হাজার। বর্তমানে কতটি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স আছে, এর সঠিক সংখ্যা আমার কাছে নেই। স্বাস্থ্য অধিদফতর ভালো বলতে পারবে। চিকিৎসক ও নার্স নেই এবং অনেক কিèনিকের সেবা দেওয়ার কোনো পরিবেশ নেইÑএ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ভালো-মন্দ সব জায়গায় আছে। তবুও আমরা সেবা দিয়ে যাচ্ছি। যদি ভালো সেবাই না দিতাম তাহলে করোনা মহামারির সময় চিকিৎসা না পেয়ে রাস্তায় মানুষ মারা যেত। কিন্তু একটা মানুষও মারা যায়নি। যেমনটা বিদেশে হয়েছে। তবে যেসব প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স নেই সেগুলো বন্ধ করলেও কোনো আপত্তি নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি।