11:27:01 pm
Tuesday, August 25

বিপন্ন তালিকায় চলে যাচ্ছে \'সবুজ-ধুমকল\' 

দুর্লভ ও বিরল পাখির খোঁজে পুরো সকালটাই কাপ্তাই জাতীয় উদ্যানের সর্পিল ছড়া ধরে হাঁটলাম। কিন্তু সে রকম কোনো পাখির দেখা পেলাম না। দুপুরে একটা সিএনজিচালিত অটোরিকশা ধরে ব্যাঙছড়ির উদ্দেশে রওনা হলাম। ব্যাঙছড়ি পর্যন্ত না গিয়ে চিৎমরম নামক জায়গায় নেমে পড়লাম। বিশাল একটা বটগাছের পাশ দিয়ে যাচ্ছি। গাছভর্তি হলুদ রঙের পাকা ফল। পাতার ফাঁকে চুপচাপ একটি সবুজ পাখি বসে আছে।’ ভালো করে দেখলাম একটি নয়, দুটি পাখি। সবুজ পাতার আড়ালে সবুজ পাখি। ভালো ছবি তোলা কিছুটা কঠিন। তাই একটু ভালো অ্যাঙ্গেল পাওয়ার আশায় রাস্তার ওপারে গেলাম। সঙ্গে সঙ্গে চোখে পড়ল আরও ছয়টি পাখি। ২৩ ডিসেম্বর ২০১৬-এর ঘটনা এটি। এর আগে কাপ্তাইয়ের ব্যাঙছড়িতে একবার এবং হবিগঞ্জের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে দুবার ওদের দেখা পেয়েছিলাম।

বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রখ্যাত পাখি বিশেষজ্ঞ ইনাম আল হক বলেন, আমাদের দেশে মাত্র ২ প্রজাতির ‘Imperial Pigeon’ অর্থাৎ ‘ধুমকল পায়রা’ রয়েছে। পৃথিবীতে রয়েছে ৪২ প্রজাতির। কিন্তু আমাদের থেকে পশ্চিমের দেশগুলোতে ওরা নেই। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ এবং দক্ষিণ, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনামের সবুজ পাহাড়ি বনগুলোতে ওরা আছে।

পাখিটির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ২০১৯ সালে আমরা হাকালুকি হাওরে পাখিশুমারির কাজ সেরে লাউয়াছড়ার ভেতর দিয়ে শ্রীমঙ্গল ফিরছি; হঠাৎ গাড়ি জানালা দিয়ে দেখি এক জোড়া Green Imperial Pigeon। সাথে সাথে গাড়ি থামিয়ে আমরা তাদের ছবি তুললাম। চা বাগানের ফাঁকা গাছে ওরা খুবই কম আসে। কিন্ত ওখানে ওরা নিমের ফল খেতে এসেছিল। এদের আকৃতি ৪৩-৪৭ সেন্টিমিটার হয়ে থাকে।

“শরীর সবুজ বলে সহজে লোকের চোখে পাড়েনা; ডানাটা একটু বেশি ঘনসবুজ। ও ঘুঘুর মতো ডাকে; কিন্তু অনেক গম্ভির গলা। বনে ঢুলকেই ডাক শুনে বুঝতে পারি ইমপেরিয়াল পিজন আছে আশেপাশে। এরা হলো ফল খাওয়া পাখি। শুধুমাত্র বুনো ফলই খায়। ওরা ঝাক বেঁধে আসে না। আমি একজোড়া গ্রিন ইমপেরিয়াল পিজন দেখতে পেলেই মহাখুশি।”

ইনাম বলেন, ‘সবুজ-ধুমকল’ বিরল পাখি; তবুও টিকে আছে। ওর বড় ভাগ্য, লোকে ওকে খুঁজে পায় না। হরিয়াল (Green Pigeon) যেমন বটগাছে আসে বলে লোকজন তাকে সহজে মেরে ফেলতে পারে। কিন্তু ধুমকলকে মারা ততটা সহজ নয়। একমাত্র চট্টগ্রামে ক’বছর আগে আমি নৃ-গোষ্ঠী মুরংদের এই পাখিটিকে বন্দুক দিয়ে মারতে দেখেছিলাম। কিন্তু সিলেটে লোকের হাতে খুব কমই মারা পড়ে। কারণ লোকে ওকে দেখতে পায় না।

পাখির প্রজনন এবং বন সম্পর্কে এ গবেষক বলেন, ‘এরা ঘুঘু পাখির মতো বছরে দুটো ডিম পাড়ে। অসুবিধা হলো- একটি ডিম ফুটলো না; বা বড় হওয়ার আগেও কোনো শিকারী পাখি/প্রাণী খেয়ে ফেললো। ফলে অনেক সময় ৫/১০ বছরেরও সে বয়স্ক বাচ্চা রেখে যেতে না পারলে ওদের বংশবিস্তার প্রাকৃতিকভাবে বাঁধাগ্রস্থ হয়। এছাড়াও এ পাখিটি যে ফল খায়; সেই ফলগাছগুলোও কমে গেছে। বন ছোট হয়ে গেছে। এরাই ফল খেয়ে বীজ ছড়িয়ে বন প্রসারিত করে। কিন্তু আমরা তো এখন বন প্রসারিত হতে দিই না। বনকে তো আমরা আটকে রেখেছি একটা ছোট্ট জায়গার মধ্যে।’

রাজকীয় অপূর্ব সুন্দর এক পাখি গ্রিন ইমপেরিয়াল পিজন; আমাদের জালালি পায়রা থেকেও সে আকারে বড়। এই পাখিটি আমাদের বনে টিকে থাকুক -এটাই আমরা চাই। এই ৪২ প্রজাতির প্রত্যেকটি পাখিই কিন্তু অপূর্ব। তবে ওদের অনেকগুলোই কিন্তু পৃথিবীতে বিপন্ন। ভাগ্যক্রমে আমাদের সবুজ ধুমকলটা রয়েছে; এখনো আমরা ‘বিপন্ন’ ঘোষণা করিনি। তবে মনে হয়- খুব শিগগির এ প্রজাতিটিও বিপন্ন তালিকায় যাবে বলে জানান প্রখ্যাত পাখি বিশেষজ্ঞ ইনাম আল হক।

Share this post

Join the conversation