চট্টগ্রাম বন্দরে চিনি ও ভোজ্য তেল নিয়ে ভাসছে ৫ জাহাজ
চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে রোজার পণ্য নিয়ে এখনও ভাসছে পাঁচটি জাহাজ। এর মধ্যে কোনো কোনো জাহাজ প্রায় দুই থেকে তিন মাস আগে রোজার পণ্য নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে আসে। বর্তমানে বন্দরের নিয়ম মোতাবেক জাহাজগুলোর শিপিং ডেমারেজ গুনতে হচ্ছে আমদানিকারকদের। ডলার সংকটের কারণে ব্যাংক আমদানি মূল্য পরিশোধ করতে না পারায় জাহাজগুলোর পণ্য খালাসের অনুমতি দিচ্ছে না রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান।
রোববার বিকালে এ তথ্য নিশ্চিত করেন চট্টগ্রাম কাস্টমসের অতিরিক্ত কমিশনার মুশফিকুর রহমান। তিনি বলেন, পবিত্র রমজান মাসকে সামনে রেখে আনা অপরিশোধিত চিনি ও ভোজ্য তেলবাহী পাঁচটি জাহাজের খালাস আটকা পড়েছে চট্টগ্রাম বন্দরে। জাহাজগুলোতে মেঘনা গ্রুপ, দেশবন্ধু গ্রুপ এবং এস আলম গ্রুপের প্রায় এক লাখ ৩৫ হাজার টন পণ্য রয়েছে। জাহাজগুলো অবস্থানের কারণে শিপিং ডেমারেজ বাবদ প্রতিদিন প্রায় এক লাখ ৫৬ হাজার ইউএস ডলার গুনতে হচ্ছে আমদানিকারকদের।
চট্টগ্রাম বন্দরের তথ্যমতে, রোজার পণ্য খালাস আটকা জাহাজগুলোর মধ্যে একটি হলো এম টি সুপার ফরটি। যে জাহাজটি ১২ হাজার টন পাম তেল নিয়ে গত ২৫ নভেম্বর মালয়েশিয়া থেকে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে এসে পৌঁছায়। ১ কোটি ২৪ লাখ ডলার মূল্যের এই তেল আমদানি করেছে চট্টগ্রামের এস আলম সুপার এডিবল অয়েল লিমিটেড।
তবে জাহাজ আসার পর ৫৮ দিন পেরিয়ে গেলেও তারা এলসি মূল্য পরিশোধ করতে না পারায় পণ্য খালাস বন্ধ রয়েছে। এদিকে জাহাজটি থেকে যত দিন পণ্য খালাস হবে না, ততদিন জরিমানা দিতে হবে আমদানিকারককে। সে হিসাবে প্রতিদিনের জরিমানার পরিমাণ প্রায় ১৬ হাজার ডলার। ৫৮ দিনে যার পরিমাণ দাঁড়ায় ৯ লাখ ২৮ হাজার ডলারে। যা বাংলাদেশি টাকায় ১০ কোটি টাকারও বেশি।
এ ছাড়া গত ২৪ ডিসেম্বর ৫৫ হাজার ৬৫০ টন চিনি নিয়ে বঙ্গোপসাগরের কুতুবদিয়ায় পৌঁছায় এমভি একিলিস নামক একটি জাহাজ। এই জাহাজের চিনি আমদানিকারকও এস আলম গ্রুপ। মূলত বিদেশি ব্যাংক থেকে ঋণপত্রের বিল পরিশোধের নিশ্চয়তা না পাওয়ায় জাহাজটি থেকে পণ্য খালাসের অনুমতি মিলছে না। ফলে বন্দরের নিয়মানুযায়ী প্রতিদিন শিপিং ডেমারেজ গুনতে হচ্ছে।
তৃতীয় জাহাজটির নাম এমভি কমন এটলাস। যেটি ব্রাজিল থেকে ৬০ হাজার ৫০০ টন চিনি নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে এসে পৌঁছায় ৫ জানুয়ারি। জাহাজটি থেকে ২৩ হাজার ৬৫০ টন চিনি খালাস হলেও বাকি পণ্যের খালাস বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ডলার সংকটে ঋণপত্রের বিপরীতে আমদানি দায় পুরোপুরি পরিশোধ করতে না পারায় বন্ধ হয়ে আছে। ফলে আমদানিকারককে প্রতিদিন ৪০ হাজার ডলার জরিমানা দিতে হবে এর বিপরীতে। জরিমানার পরিমাণ ১১ দিনে দাঁড়ায় ৪ লাখ ৪০ হাজার ডলারে। যা বাংলাদেশি টাকায় দাঁড়ায় ৫ কোটি টাকার উপরে।
চতুর্থ জাহাজ এমভি ট্রঅং মিন প্রসপারিটি ৫৫ হাজার টন চিনি নিয়ে বন্দর জলসীমায় পৌঁছায় গত ১৮ অক্টোবর। আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান দেশবন্ধু গ্রুপ। একটানা ৯২ দিনে জাহাজটি থেকে ২৯ হাজার ২৩৯ টন চিনি খালাস হয়েছে। ডলারে আমদানি মূল্য শোধ না করায় বাকি ২৫ হাজার ৭৫১ টন পণ্য খালাসের অনুমতি দিচ্ছে না রফতানিকারক। জটিলতা না থাকলে সাধারণত ৮ থেকে ১০ দিনে এই চিনি খালাস হওয়ার কথা।
এদিকে ব্রাজিল থেকে অপরিশোধিত সয়াবিন তেল নিয়ে বন্দর জলসীমায় আসা পঞ্চম জাহাজ হচ্ছে এম টি সোগান। ওই জাহাজটি ৬ জানুয়ারি চট্টগ্রাম বন্দরে আসে। এসব সয়াবিন তেলের আমদানিকারক বাংলাদেশ এডিবল অয়েল ও মেঘনা অয়েল রিফাইনারি লিমিটেড। জাহাজটি থেকে বাংলাদেশ এডিবল অয়েলের তেল খালাস করা হলেও আটকে আছে মেঘনা এডিবল অয়েল রিফাইনারির পণ্য। জাহাজটিতে প্রতিষ্ঠানটির ৬২ লাখ ডলারের প্রায় ৫ হাজার টন তেল রয়েছে। আমদানিকারকের প্রতিদিনের জরিমানা ৩৮ হাজার ডলার (৪০ লাখ টাকা)।
এমটি সোগান জাহাজের স্থানীয় প্রতিনিধি প্যানমেরিন শিপিং লাইন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আসলাম বলেন, বিদেশি জাহাজের প্রতিদিনের ক্ষতিপূরণ বেশি। ক্ষতিপূরণ কমাতে জাহাজটি থেকে তেল দেশীয় একটি জাহাজে স্থানান্তর করা হয়েছে। আর বিদেশি জাহাজটি গত সোমবার সন্ধ্যায় বন্দর ত্যাগ করেছে। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, দেশীয় জাহাজে স্থানান্তর করা হলেও তা এখনও খালাসের সুযোগ নেই। কারণ দেশীয় জাহাজটির পণ্যও রফতানিকারকের জিম্মায় রয়েছে।
জানতে চাইলে মেঘনা গ্রুপের এক কর্মকর্তা নাম না জানিয়ে বলেন, রোজায় যাতে কোনো সংকট না হয়, সে জন্য আগেভাগে পণ্য আমদানির ঋণপত্র খোলা হয়েছিল। টাকার অঙ্কে এলসি ওপেন করা হয়। এর মধ্যে একটির এলসি ওপেন হয় অগ্রণী ব্যাংক থেকে। কিন্তু ব্যাংক এলসির টাকা পরিশোধ করতে না পারায় পণ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান জাহাজ থেকে পণ্য খালাস বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে জাহাজ ভাড়া বাবদ যে ডেমারেজ উঠছে সেগুলো আমাদের পরিশোধ করতে হবে। আমরা এগুলো পণ্য মূল্যের সঙ্গে সমন্বয় করব। তবে এই সংকট কীভাবে দ্রুত সমাধান করা যায় আমরা সেই চেষ্টা করছি।
একই কথা বলেছেন এস আলম গ্রুপের মিডিয়া অ্যাডভাইজর মো. আকিজ উদ্দিন। তিনি বলেন, ডলারে আমদানি মূল্য পরিশোধ করতে না পারায় নিত্যপণ্য বহনকারী জাহাজ থেকে পণ্য খালাস করা যাচ্ছে না। তবে বিষয়টি সুরাহার পথে। হয়তো শিগগির পণ্য খালাস করা সম্ভব হবে।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-ক্যাবের চট্টগ্রাম মহানগরের সভাপতি জেসমিন সুলতানা পারু বলেন, বড় গ্রুপগুলো যেখানে আমদানি করতে হিমশিম খাচ্ছে, সেখানে অন্যদের অবস্থা কী তা সহজেই অনুমেয়। আমদানি কমলে রোজায় সরবরাহ কমবে। ইতিমধ্যে চিনি ও গম আমদানি কমার প্রভাব পড়েছে বাজারে। ডলার সংকট দ্রুত সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক ডলার সংকট সমাধান করতে পারছে না। এ অবস্থা চলতে থাকলে পরিস্থিতির আরও অবনতি হবে। বিদেশি ব্যাংকগুলো ঋণের বিপরীতে নিশ্চয়তা দেওয়া থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে। এ জন্য ডলার সংকট দ্রুত সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

Join the conversation