11:03:33 am
Sunday, June 21

নিকোলস হত্যাকাণ্ড: জোরালো হচ্ছে পুলিশ ও ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থা

কৃষ্ণাঙ্গ তরুণ টায়ার নিকোলস হত্যার ঘটনা আবার সেখানকার বর্ণবাদী পুলিশি-বন্দোবস্ত আর ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার সংস্কারের প্রশ্ন সামনে এনেছে। নিকোলসকে হত্যায় অভিযুক্ত কর্মকর্তারা যে ইউনিটে কাজ করতেন, স্করপিয়ন নামে পরিচিত সেই বিশেষ ইউনিট এরই মধ্যে বিলুপ্ত করে দিয়েছে মেম্ফিসের পুলিশ।

কৃষ্ণাঙ্গ তরুণ টায়ার নিকোলস হত্যার ঘটনা আবার সেখানকার বর্ণবাদী পুলিশি-বন্দোবস্ত আর ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার সংস্কারের প্রশ্ন সামনে এনেছে। নিকোলসকে হত্যায় অভিযুক্ত কর্মকর্তারা যে ইউনিটে কাজ করতেন, স্করপিয়ন নামে পরিচিত সেই বিশেষ ইউনিট এরই মধ্যে বিলুপ্ত করে দিয়েছে মেম্ফিসের পুলিশ। তবে বিশ্লেষকরা একেই যথেষ্ট মনে করছেন না। তাদের দাবি, দেশজুড়ে স্করপিয়নের মতো আরও অসংখ্য ইউনিট রয়েছে। 
কৃষ্ণাঙ্গ, বাদামি কিংবা দরিদ্র জনগোষ্ঠীর অধিকার সুরক্ষায় তাই পুলিশ ও সামগ্রিক ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার সংস্কার প্রয়োজন। এদিকে নিকোলস হত্যার প্রতিবাদে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে।
কৃষ্ণাঙ্গ তরুণ টায়ার নিকোলসকে চলতি মাসের শুরুর দিকে (৭ জানুয়ারি) পাঁচ পুলিশ কর্মকর্তার নির্মম মারধরের ভিডিওটি শুক্রবার পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী জনগণের জন্য উন্মুক্ত করে দেয় মেম্ফিস পুলিশ। এতে দৃশ্যমান কোনো কারণ ছাড়াই নজিরবিহীন নিপীড়ন চালিয়ে টায়ারকে নিস্তেজ করে ফেলতে দেখা গেছে। লাঠি দিয়ে আঘাত ও মুখে মরিচের গুঁড়া ছিঁটানোর পাশাপাশি তাকে ঘুষি ও লাথি মারতে দেখা গেছে। মাকে ডাকতে ডাকতে নিস্তেজ হয়ে পড়েন নিকোলস। ১০ জানুয়ারি তিনি মারা যান। ভিডিওতে আরও দেখা গেছে, জরুরি স্বাস্থ্যসেবাকর্মীরা পৌঁছানোর ১৯ মিনিট পর সেখানে স্ট্রেচার পৌঁছায়। মেম্ফিসের পুলিশপ্রধান সেরেলিন ডেভিস এ ঘটনাকে মানবতার জন্য অবমাননাকর আখ্যা দিয়েছেন। নিকোলসের মৃত্যুর ঘটনায় পাঁচ পুলিশ কর্মকর্তাকে ২১ জানুয়ারি চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। তারা সবাই কৃষ্ণাঙ্গ। বৃহস্পতিবার তাদের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় মাত্রার খুন, হামলা, অপহরণ, অসদাচরণ ও নিপীড়নের আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আনা হয়। এই পাঁচ কর্মকর্তার মধ্যে চারজনই জামিন আবেদন করেছিলেন, তার প্রেক্ষিতে শুক্রবার সকালে তারা নিরাপত্তা হেফাজত থেকে ছাড়া পান বলে জানাচ্ছে জেলখানার রেকর্ড। মার্টিন ও মিলসের আইনজীবীরা বলেছেন, তাদের মক্কেলরা নিজেদের দোষী বলে মেনে নেবেন না।
মেম্ফিস পুলিশের বিশেষ ইউনিট বিলুপ্ত, স্বাগত জানিয়েছে নিকোলসের পরিবার : গাড়ি চুরি ও সংঘবদ্ধ সহিংসতার মতো অপরাধ দমনে ২০২১ সালের অক্টোবরে পুলিশের বিশেষ ‘স্ট্রিট ক্রাইমস অপারেশন টু রিস্টোর পিস ইন আওয়ার নাইবারহুড’ বা স্করপিয়ন ইউনিটটি গঠন করা হয়। ৫০ সদস্যের এই ইউনিটটি মূলত সুনির্দিষ্ট কিছু এলাকায় অপরাধের পরিমাণ কমিয়ে আনার দায়িত্বে ছিল। কিন্তু ৭ জানুয়ারির এক ভিডিওতে ২৯ বছর বয়সি নিকোলসকে মারধরে এই ইউনিটের কর্মকর্তাদের জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়ার এটি বিলুপ্ত করে দেওয়া হলো। ‘সবার স্বার্থেই ইউনিটটি স্থায়ীভাবে নিষ্ক্রিয় করা হলো,’ বিবৃতিতে মেম্ফিসের পুলিশ এ কথা বলেছে বলে জানিয়েছে বিবিসি। ‘কয়েকজনের বর্বর কর্মকাণ্ড স্করপিয়নকে অসম্মানের মেঘে ঢেকে দেওয়ায়, ক্ষত নিরাময়ে আগ বাড়িয়ে পদক্ষেপ নেওয়া আমাদের মেম্ফিস পুলিশ বিভাগের জন্য খুবই জরুরি হয়ে উঠেছিল,’ বলা হয়েছে বিবৃতিতে।
পুলিশের স্করপিয়ন ইউনিট বিলুপ্তির সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে নিকোলসের পরিবার। তাদের আইনজীবী এ পদক্ষেপকে ‘টায়ার নিকোলসের দুঃখজনক মৃত্যুর প্রতিক্রিয়ায় উপযুক্ত ও সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং মেম্ফিসের সব নাগরিকের জন্য ভালো ও ন্যায়সঙ্গত কাজ’।
বিক্ষোভ অব্যাহত, পুলিশ ও বিচারব্যবস্থার সংস্কার দাবি : ‘যে ইউনিট টায়ারকে খুন করেছে, সেটিকে স্থায়ীভাবে বিলুপ্ত করা হয়েছে,’ হ্যান্ডমাইকে এক বিক্ষোভকারী এ ঘোষণা দেওয়ার পরপরই মেম্ফিসে জড়ো হওয়া বিক্ষোভকারীরা উল্লাসে ফেটে পড়েন। শনিবার বৃষ্টি উপেক্ষা করেই প্রায় শখানেক বিক্ষোভকারী মেম্ফিস পুলিশ সদর দফতরের সামনের চত্বরে জড়ো হয়ে মেম্ফিসসহ যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে কৃষ্ণাঙ্গদের ওপর নির্মম অত্যাচার অভ্যাসে পরিণত হওয়া পুলিশি ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন দাবি করেন। ‘মেম্ফিস তার অবস্থান জানান দিচ্ছে। এর অর্থ, আমরা সঠিক কিছু করছি,’ বলেছেন বিক্ষোভের অন্যতম আয়োজক ক্যাসিও মন্টেজ।অনেকেই মনে করছেন, পুলিশি সহিংসতা এমন জায়গায় গিয়ে পৌঁছেছে যেকোনো সংস্কারই আর কাজে আসবে না। শনিবারের সমাবেশে মেম্ফিসের বাসিন্দা অ্যালি ওয়াটকিনস এক প্ল্যাকার্ড হাতে এসেছিলেন, যাতে লেখা রয়েছে, ‘সব পুলিশই শে^তাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদের ধারক’। তিনি বলেছেন, এই কথা ঐতিহাসিকভাবেই সঠিক, কেননা যুক্তরাষ্ট্রে পুলিশের ইতিহাস শুরুই হয়েছিল দাসদের টহল দিয়ে, বলেছেন তিনি। ‘এটা যুক্তরাষ্ট্রের দুর্নীতির কোনো ইস্যু নয়। এটা হচ্ছে এমন এক ইস্যু, যেখানে বলা হচ্ছে পুরো পুলিশি ব্যবস্থাপনা তৈরিই হয়েছে কৃষ্ণাঙ্গদের বিরুদ্ধে। যদি এই সিস্টেম ভেঙে যায়, তাহলে ঠিক করার উপায় হচ্ছে নতুন করে শুরু করা,’ বলেন ওয়াটকিনসন।
জন জে কলেজ অব ক্রিমিনাল জাস্টিজের সাংবিধানিক আইন ও ফৌজদারি অপরাধের অধ্যাপক গ্লোরিয়া ব্রাউনি মার্শাল বিবিসিকে বলেছেন, ‘আমাদের জাতীয় ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার সংস্কার দরকার।’ তিনি বলেন, স্করপিয়নের মতো ইউনিটগুলো দেশজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। আংশিক সংস্কার কোনো কাজে আসবে না।
এলিজাবেথ হাউস স্কুল অব লর অধ্যাপক র‌্যানডলফ ম্যাকলাফলিন দ্য গার্ডিয়ানকে বলেছেন, নিকোলসের মৃত্যুই প্রমাণ করে যে কেন যুক্তরাষ্ট্রের পুলিশ ও বিচারব্যবস্থায় একটা বড় ধরনের সংস্কার দরকার। ‘ওই ব্যক্তি (নিকোলস) কোনো অপরাধী ছিলেন না। তিনি স্রেফ তার বাড়িতে তার মায়ের কাছে যেতে চাচ্ছিলেন। এর বাইরে আর কিছুই করতে চাননি তিনি। এটাই প্রমাণ করে, আমাদের জাতীয় পর্যায়ে সংস্কার দরকার।’ তিনি আরও বলেন, নিকোলসের ঘটনা বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। কৃষ্ণাঙ্গ, বাদামি ও দরিদ্ররা প্রতিনিয়ত একই কায়দায় এসবের মুখোমুখি হচ্ছে।