কুকিদের ভয়ে পালাচ্ছে পাহাড়িরা
বিচ্ছিন্নতাবাদী সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ‘কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের (কেএনএফ)’ তাণ্ডবের মুখে প্রাণ বাঁচাতে নিজেদের পাহাড়ি বসতভিটা ছেড়ে জনসমাগমপূর্ণ এলাকায় আশ্রয় নিচ্ছেন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নিরীহ বাসিন্দারা। গত দুই দিনে রুমা উপজেলা সদরে আশ্রয় নিয়েছে মারমা ও বম সম্প্রদায়ের দুই শতাধিক বাসিন্দা।
বিচ্ছিন্নতাবাদী সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ‘কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের (কেএনএফ)’ তাণ্ডবের মুখে প্রাণ বাঁচাতে নিজেদের পাহাড়ি বসতভিটা ছেড়ে জনসমাগমপূর্ণ এলাকায় আশ্রয় নিচ্ছেন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নিরীহ বাসিন্দারা। গত দুই দিনে বান্দরবানের দুর্গম এলাকা থেকে রুমা উপজেলা সদরে আশ্রয় নিয়েছে মারমা ও বম সম্প্রদায়ের দুই শতাধিক বাসিন্দা। এ ছাড়াও কুকি সন্ত্রাসীদের ভয়ে আরও অন্তত অর্ধশত বাসিন্দা নিজ গ্রাম ছেড়ে অন্যত্র পালিয়ে গেছে বলে খবর পাওয়া গেছে। তবে এ বিষয়ে দায়িত্বশীল কেউ নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারেনি।
এর মাঝেই বান্দরবানের দুর্গম ওই পাহাড়ি এলাকায় এখনও থেমে থেকে চলছে গোলাগুলি। নিরাপত্তা বাহিনীর অব্যাহত কঠোর অভিযানে এক এলাকা থেকে পালিয়ে আরেক গহিন এলাকায় আস্তানা তৈরি করছে কুকি সন্ত্রাসীরা। সর্বশেষ গত ২-৩ দিন ধরে রুমার দুর্গম মুন্নম পাড়া, আরথা পাড়া ও মুয়ালপি পাড়া এলাকায় সেনাবাহিনীর সঙ্গে কেএনএফ সন্ত্রাসীদের গোলাগুলির ঘটনা ঘটে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা যায়। তারই জেরে রোববার সকালে রুমার ওই পাহাড়ি এলাকায় তল্লাশি চালিয়ে সাবাতংপাড়া থেকে একজন কেএনএফ সদস্যের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এ সময় একটি লম্বা বন্দুক ও বেশ কিছু গুলি উদ্ধার করেছে পুলিশ। এদিকে এ ঘটনার পর কেএনএফের একাধিক ফেসবুক পেজে নিহতের নাম পরিচয়সহ নানা তথ্য ও বক্তব্য প্রকাশ করা হয়েছে। নিহত ব্যক্তিকে কুকি চিন ন্যাশনাল আর্মির (কেএনএ) সদস্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে রুমা থানার ওসি মো. আলমগীর হোসেন সময়ের আলোকে বলেন, বিগত দুই দিন ধরে সেনাবাহিনী ও কেএনএফের সন্ত্রাসীদের মধ্যে গোলাগুলি হয়। এতে এক পর্যায়ে সেনা অভিযানে পিছু হটতে বাধ্য হয় সন্ত্রাসী গোষ্ঠী। পরবর্তীতে রুমা উপজেলার দুর্গম বাসাতং পাড়ায় তল্লাশিকালে এক কেএনএফ সদস্যের গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এ সময় সেখান থেকে আগ্নেয়াস্ত্র ও গুলি জব্দ করা হয়। রোববার সন্ধ্যা পর্যন্ত আনুমানিক ২৫ থেকে ৩০ বছর বয়সি নিহত ওই কুকি সন্ত্রাসীর নাম জানা যায়নি।
ওসি আলমগীর হোসেন আরও বলেন, কয়েক দিন ধরে রুমার অত্যন্ত দুর্গম ময়ালপি পাড়ায় কুকি সন্ত্রাসীরা তাণ্ডব চালিয়ে যাচ্ছিল। পরে প্রাণ বাঁচাতে সেখানকার বেশকিছু মারমা ও বম সম্প্রদায়ের বাসিন্দারা রুমা উপজেলা সদরে এসে আশ্রয় নিয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিরা তাদের দেখভাল করছে। রুমার ওই অঞ্চলটি এখনও থমথমে অবস্থায় রয়েছে বলেও জানান তিনি।
এ প্রসঙ্গে আলাপকালে রুমার দুর্গম পাইন্দু ইউনিয়নের চেয়ারম্যান উহ্লা মং মারমা রোববার সন্ধ্যায় মোবাইল ফোনে সময়ের আলোকে বলেছেন, দুর্গম মুয়ালপি এলাকা থেকে শনিবার সন্ধ্যায় প্রাণ ভয়ে পালিয়ে ৫২টি পরিবারের ১৬৭ জন বাসিন্দা রুমা সদরে এসেছে। এ ছাড়াও একই কারণে সেখানকার বম জনগোষ্ঠীর ২০টি পরিবারের ৪০ জনের মতো সদস্য গ্রাম ছেড়ে উপজেলা সদরে আশ্রয় নিয়েছে। তাদেরকে রুমা মারমা ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের হলরুমে থাকা ও খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
উহ্লা মং মারমা আরও বলেন, যারা নিজ ভিটা ছেড়ে পালিয়ে এসেছে তাদের সঙ্গে আমরা কথা বলেছি। তারা বলেছে, কেএনএফ সন্ত্রাসীরা তাদের বসতভিটায় আস্তানা গড়ার চেষ্টা করে। তারা বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে নির্যাতন ও ভয়ভীতিসহ নানা রকম তাণ্ডব চালায়। একপর্যায়ে প্রাণভয়ে তারা পাহাড়ি ভিটেমাটি ত্যাগ করে যার যতটুকু সম্বল তা নিয়ে উপজেলা সদরে চলে আসেন।
বান্দরবানের স্থানীয়রা জানান, রুমা উপজেলার পাইন্দু ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের মুয়ালপি পাড়ার লোকজন বসতভিটা ছেড়ে প্রাণ ভয়ে ৪ ঘণ্টা পায়ে হেঁটে শনিবার সন্ধ্যায় উপজেলা সদরে আশ্রয় নিয়েছে। উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরের পাইন্দু ইউনিয়নের মুয়ালপি পাড়া, আর্থা পাড়া, প্রাংসা পাড়া, ইলি চান্দা পাড়া, ক্যকটাই পাড়া, ঞ্যাংক্ষ্যং পাড়াসহ প্রায় ১২টি পাড়ার লোকজন গত তিন দিন ধরে কুকি সন্ত্রাসীরা তাণ্ডব শুরু করে। এরপর গোয়েন্দা তথ্যে সেখানে সেনাবাহিনী কুকি সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করে। এ অবস্থায় আতঙ্কে নিজেদের পাড়া ছেড়ে বিভিন্ন জঙ্গলে আশ্রয় নেয় নিরীহ সাধারণ বাসিন্দারা। পরবর্তীতে তারা উপজেলা সদরে ঠাঁই নেয়।
আশ্রয় গ্রহণ করা অনেকেই বলেছে, দুর্গম এলাকা হওয়ায় তাদের গ্রামের ভেতর দিয়ে কেএনএফ প্রতিনিয়ত চলাচল করত। তাদের এই চলাচলের কারণে গ্রামবাসী আতঙ্কিত হয়ে ঘর থেকে বের হতে পারত না। সেখানকার স্থানীয় এক ব্যক্তিকে কেএনএফ ধরে নিয়ে মারধর করে। আহত অবস্থায় জঙ্গল থেকে তাকে উদ্ধার করে গ্রামবাসীরা। তাদের গ্রাম থেকে বাইরে না যাওয়ারও হুমকি দেয় কুকি সন্ত্রাসীরা। এরপরও ওই এলাকায় ব্যাপক গোলাগুলির আওয়াজ শুনতে পেয়ে তারা প্রাণ বাঁচাতে যে যার মতো পারে গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে উপজেলা সদরে আসে।
রুমা উপজেলার নির্বাহী অফিসার মামুন শিবলী সময়ের আলোকে জানান, দুর্গম পাহাড়ের ঘরবাড়ি ছেড়ে রুমা সদরে আশ্রয় নেওয়া বাসিন্দাদের উপজেলা পরিষদ থেকে কম্বল দেওয়া হয়েছে। পাইন্দু ইউনিয়ন পরিষদ ও আশ্রমের ভান্তে তাদেরকে খাবারের ব্যবস্থা করেছেন। প্রায় ১২টি পাড়ার লোকজন প্রাণভয়ে বিভিন্ন জায়গায় পালিয়ে গেছে বলে তিনি স্থানীয়দের কাছে শুনেছেন।
জানা যায়, গত বছরের অক্টোবর থেকে বান্দরবানের রুমা ও রোয়াংছড়িসহ বিভিন্ন এলাকায় কেএনএফ ও নতুন জঙ্গি সংগঠনের সশস্ত্র জঙ্গিদের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে এলিটফোর্স র্যাবসহ নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা। কেএনএফপ্রধান নাথান বমের সার্বিক তত্ত্বাবধানে দুর্গম এলাকায় কেএনএফকে মাসিক ৩ থেকে ৫ লাখ টাকার বিনিময়ে ‘জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়া’র সদস্যদেরকে প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কেএনএফের সঙ্গে জোট বাঁধা জঙ্গি সংগঠন হিন্দাল শারক্বীয়ার সদস্যরাও বর্তমানে ওই এলাকায় টিকে থাকার জন্য নানা ধরনের তৎপরতা চালাচ্ছে। নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর অভিযান ও নজরদারির কারণে স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হওয়ায় জঙ্গিরা স্থানীয় পাহাড়ি বাসিন্দাদের বাসা-বাড়ি থেকে লুটপাট চালিয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে পাহাড়ের ওই দুর্গম এলাকায় গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে নিয়মিত নজরদারি ও অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে র্যাব।
এ প্রসঙ্গে র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন সময়ের আলোকে বলেন, কেএনএফের ঘাঁটিতে প্রশিক্ষণ নেওয়া বেশকিছু জঙ্গিকে ইতিমধ্যেই গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। বান্দরবানের দুর্গম ওইসব এলাকায় র্যাবের অভিযান এখনও চলমান এবং পুরো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে।
