11:26:35 am
Sunday, June 21

রোহিঙ্গা সংকটে মিলছে না সুখবরের বার্তা

মিয়ানমার সরকার এবং দেশটির জান্তা বাহিনীর সৃষ্টি করা প্রায় সাড়ে ১২ লাখ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর যে বোঝা বইছে বাংলাদেশ তা সমাধানে কোনো সুখবরের বার্তা মিলছে না। উল্টো এ সংকট থেকে আরও একাধিক সংকটের সৃষ্টি হচ্ছে।

মিয়ানমার সরকার এবং দেশটির জান্তা বাহিনীর সৃষ্টি করা প্রায় সাড়ে ১২ লাখ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর যে বোঝা বইছে বাংলাদেশ তা সমাধানে কোনো সুখবরের বার্তা মিলছে না। উল্টো এ সংকট থেকে আরও একাধিক সংকটের সৃষ্টি হচ্ছে। 

বিশ্লেষকরা বলছেন, বিশ্ব পরিস্থিতিতে পরিবর্তন না এলে রোহিঙ্গা সংকট আরও ৫ বছর দীর্ঘ হলেও অস্বাভাবিক হবে না। অন্যদিকে, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন যে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে মিয়ানমারের একটি প্রতিনিধি দলের শিগগিরই ভেরিফিকেশনে আসার কথা রয়েছে।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, সর্বশেষ রোহিঙ্গা ঢলের ৫ বছর পূর্ণ হয়ে ৬ বছর চলছে। কিন্তু এই দীর্ঘ সময়ে এ সংকট সমাধানে মিয়ানমারের পক্ষ থেকে ইতিবাচক কোনো বার্তা পাওয়া যায়নি। সর্বশেষ এ ইস্যুতে মিয়ানমারের সঙ্গে গত বছরের মধ্যভাগে ৫ম পর্যায়ের জয়েন্ট ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠক হয়। ওই বৈঠকের মূল আলোচ্য বিষয় ছিল, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী যাতে তাদের মাতৃভূমি মিয়ানমারে স্বেচ্ছায়, পূর্ণ নাগরিক অধিকার নিয়ে সম্মানের সঙ্গে ফেরত যেতে পারে সেজন্য দুপক্ষ কাজ করবে। প্রত্যাবাসন ইস্যুতে রোহিঙ্গাদের মাঝে আস্থার সম্পর্ক গড়তে ওই বৈঠকে স্বল্প পরিসরে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু ওই বৈঠকে মিয়ানমার এ সিদ্ধান্তে সম্মতি প্রকাশ করলেও বৈঠকের পর আর কোনো আগ্রহ দেখাচ্ছে না। 

ঢাকার কূটনীতিকরা বলছেন, এটি মিয়ানমারের পুরোনো অভ্যাস। তারা কোনোকিছুই না করে না কিন্তু বাস্তবে যা করা প্রয়োজন তার ধারেকাছেও যায় না দেশটি। জানা গেছে, প্রত্যাবাসনের জন্য বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত কমবেশি ৮ লাখ ২৮ হাজার রোহিঙ্গা তথ্য-উপাত্ত যাচাই-বাছাই করার জন্য মিয়ানমারকে দিয়েছে। কিন্তু সেখান থেকে মাত্র ৭ শতাংশের কিছু বেশি রোহিঙ্গার তথ্য-উপাত্ত যাচাই-বাছাই করে বাংলাদেশকে জানিয়েছে মিয়ানমার।

এদিকে রোহিঙ্গা ইস্যুতে প্রতিবেশী ভারত ও চীনের কাছ থেকে এখনও সক্রিয় সহযোগিতা পায়নি বাংলাদেশ। চীনের মধ্যস্থতায় ২০১৯ সালে সংকট মেটাতে যে ত্রিপক্ষীয় কমিটি গঠন করা হয়েছিল তাতেও কোনো ফল আসেনি। অন্যদিকে এ মুহূর্তে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে যে প্রভাব ফেলেছে তাতে রোহিঙ্গা সংকট সমাধান নিয়ে বিশে^র নজর দেওয়ার ক্ষেত্রেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, রোহিঙ্গা সংকটে সহায়তার জন্য যে যৌথ সমন্বিত পরিকল্পনা (জেআরপি) তহবিল গঠন করা হয়েছে তাতে চাহিদার ৫১ শতাংশ তহবিল এখনও জোগাড় হয়নি। এরপর গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ওই তহবিলে আরও ৭৫ মিলিয়ন ডলার অনুদান দিয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন যে বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে পরিবর্তন না এলে রোহিঙ্গা সংকট আরও দীর্ঘ হবে। এ সময়ে প্রতিটি দেশই নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় ব্যস্ত। যে কারণে রোহিঙ্গা সংকট নজর থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। রোহিঙ্গা সংকট দেশের অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। 

দৈনিক সময়ের আলোর কক্সবাজার প্রতিনিধি জানান, গত সাড়ে পাঁচ বছরে রোহিঙ্গাদের শীর্ষ নেতা মুহিবুল্লাহসহ ক্যাম্পে ১৩০টির বেশি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া ক্যাম্প এলাকার আশপাশের পাহাড়ে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা গড়ে তুলেছে গোপন আস্তানা। স্থানীয় কৃষক, ছাত্র ও শ্রমিকদের অপহরণ করে পাহাড়ে করা আস্তানায় নিয়ে যায় রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা। মুক্তিপণ না পেলে তাদের হত্যা করে লাশ গুম করে ফেলে। 

কক্সবাজার পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) রফিকুল ইসলাম জানান, বিগত ২০১৭ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত ক্যাম্পে ১২০টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। খুনাখুনি, অপহরণ, ধর্ষণ, মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি, মানব পাচার, অগ্নিসংযোগসহ ১৪ ধরনের অপরাধের সঙ্গে রোহিঙ্গা জড়িয়ে পড়েছে। এসব কারণে ১ হাজার ৯৮০টি মামলা হয়েছে।

গত ২২ জানুয়ারি বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের নতুন রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলমের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সাক্ষাৎ শেষে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম বলেন, ‘ভেরিফিকেশনের জন্য শিগগিরই মিয়ানমারের একটি প্রতিনিধি দল আসবে’। 

চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন বলেন, ‘রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে চীন বাংলাদেশকে সহযোগিতা করছে এবং তা অব্যাহত থাকবে। মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি ভালো না থাকায় সময় লাগছে। এ সংকট মেটাতে চীনের নেতৃত্বে যে ত্রিপক্ষীয় কমিটি গঠন করা হয়েছিল ওই কমিটিও কাজ করছে’।

কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, রোহিঙ্গা সংকট সমাধান এখন আসিয়ানের (দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জোট) মাধ্যমে চায় চীন। চীন মনে করে যে আসিয়ান চাপ সৃষ্টি করলে এ সংকটের সমাধান সম্ভব। 

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন বলেন, ‘আসিয়ান দেশগুলো আগামীতে শক্তিশালী হচ্ছে। তাদের সঙ্গে আরও দৃঢ় সম্পর্ক গড়তে চাই। রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানের জন্য তাদের দরকার’।

সাবেক পররাষ্ট্র সচিব মো. তৌহিদ হোসেন এই প্রতিবেদককে বলেন, এ সংকট আরও ৫ বছর দীর্ঘ হলেও অস্বাভাবিক কিছু নয়। কারণ হচ্ছে রোহিঙ্গা তরুণদের আমরা কাজে লাগাতে পারিনি, বৈশ্বিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল না এবং সংকট মেটাতে ভারত-চীন আমাদের প্রত্যক্ষভাবে সহযোগিতা করছে না। বৈশ্বিক পরিস্থিতি না বদলালে এ সংকটের সমাধান সম্ভব না। এ ছাড়া ক‚টনীতির সঙ্গে শক্তি প্রদর্শনের বিষয়ও থাকতে হবে। কূটনীতির সঙ্গে শক্তির প্রদর্শনের সমন্বয় না থাকলে সহজে সমাধান আসবে না।

মিয়ানমারে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক সামরিক এটাশে এবং সাবেক রাষ্ট্রদূত শহুদুল হক এ প্রতিবেদককে বলেন, গত ৫ বছরে সংকট সমাধানে কোনো অগ্রগতি হয়নি। বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে এ সংকট থেকে বিশ^বাসীর নজর অন্য দিকে চলে গেছে। আমাদের আরও প্রো-অ্যাক্টিভ ভূমিকা নিতে হবে। কিছু দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের সিনেট বিভাগ মিয়ানমার ইস্যুতে বার্মা আইন অনুমোদন করেছে। প্রয়োজনে প্রো-অ্যাক্টিভ রোল নিয়ে ওই আইন আমাদের পক্ষে কাজে লাগানো যায় কি না তা দেখতে হবে।