‘সাহিত্যই তরুণ প্রজন্মকে সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদের হাত থেকে বাঁচাতে পারে’
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, তরুণ প্রজন্মকে সাহিত্যে যত বেশি আকর্ষিত করতে পারব, তারা ততবেশি সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের দিকে যাবে না। আমাদের সাহিত্যের আলাদা একটা মাধুর্য আছে। আমাদের পাখির ডাক, সবুজ শ্যামল বাংলায় রয়েছে সেটি বিদেশে ছড়িয়ে যাক।
সাহিত্যই তরুণ প্রজন্মকে সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদের হাত থেকে বাঁচাতে পারে এমন মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, তরুণ প্রজন্মকে সাহিত্যে যত বেশি আকর্ষিত করতে পারব, তারা ততবেশি সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের দিকে যাবে না। আমাদের সাহিত্যের আলাদা একটা মাধুর্য আছে। আমাদের পাখির ডাক, সবুজ শ্যামল বাংলায় রয়েছে সেটি বিদেশে ছড়িয়ে যাক। জেলায় জেলায় আমরা বইমেলা করছি। বিভিন্ন দেশের কূটনৈতিক মিশন আছে, তাদের মাধ্যমে বিদেশী বইমেলায় অংশগ্রহণ করা যেতে পারে।
বুধবার (১ ফেব্রুয়ারি) বাংলা একাডেমি আয়োজিত ‘পড়ো বই গড়ো দেশ, বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ’ প্রতিপাদ্য নিয়ে অমর একুশে বইমেলা উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। প্রথমে জাতীয় সঙ্গীতের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু হয়। এসময় কোরআন তেলাওয়াত, পবিত্র গীতা, ত্রিপঠক পবিত্র বাইবেল পাঠ করা হয়। পরে শহীদদের স্মৃতির প্রতি সম্মান জানিয়ে একমিনিট নীরবতা পালন করা হয়। ৭ টি বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করেন। পরে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে গ্ৰহণ করেন পুরস্কারপ্রাপ্তরা।
তিনি বলেন, বাংলা সাহিত্যে যত বই বের হবে সেগুলো বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদ হতে হবে। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট নিতে পারে। এই অনুবাদ হবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে। বিভিন্ন ভাষায় যেন এই সাহিত্য অনুবাদ হয়। করোনা মোকাবেলায় সবচেয়ে বেশি কাজে লেগেছে ডিজিটাল সিস্টেম। বইগুলোকে ডিজিটালাইজড করা অডিও ভার্শন করা যেতে পারে। যে কোন অ্যাপসের মাধ্যমেই সেটি শোনা যেতে পারে। আমাদের দেশটাকে আরও আধুনিক প্রযুক্তি নিয়ে চলা উচিত বলে আমি মনে করি। এখন আর কেউ কিন্তু খুব একটা বই খুলে পড়তে চায় না। একটা বই হাতে নিয়ে বইয়ের পাতা উল্টে উল্টিয়ে পড়ার মধ্যে যে অনুভূতি পাওয়া যায় প্রযুক্তির মাধ্যমে শুনলে সেটি পাওয়া যাবে না। তাই ডিজিটাল ভার্সন করা একান্তভাবে দরকার। জাতির পিতা জাতিসংঘের প্রথম ভাষণ দিয়েছিলেন কিন্তু বাংলা ভাষায়। আমি যতবার ভাষণ দিয়েছি জাতিসংঘে কদম কমিশন করে বাংলা ভাষায় ভাষণ দিয়েছি। আমি চাই বিশ্ব সাহিত্যের সাথে আমাদের ভাষার একটা পরিচয় ঘটানো।
তিনি আরও বলেন, করোনাভাইরাসের কারণে গত দুই বছর বইমেলায় আসতে পারিনি। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর আগের মত সেই স্বাধীনতা নেই। আসতে পারি না। করোনার কারণে ২ বছর আসতে পারিনি। আমি সবসময় বাংলা একাডেমি লাইব্রেরী ব্যবহার করতাম। এখানে আমার আলাদা ভালো লাগার ছিল। বাংলা ভাষার একটি ঐতিহাসিক ভাষা, হাজার বছরের ইতিহাস। বাংলা ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য যে সংগ্রাম শুরু হয়েছে ৪৮ সালে ২রা মার্চ। ১৯৪৮ সাল সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে সবাইকে নিয়ে বসে এগারো মার্চ যে কর্মসূচি ঘোষণা করা হয় তার কারণ ছিল পাকিস্তানি শাসকরা উর্দু ভাষা আমাদের উপর চাপিয়ে দিয়েছিল। ১৯৪৮ সালে পাকিস্তানের ইনটেলিজেন্ট ব্রাঞ্চ যে রিপোর্ট দিয়েছে সেই রিপোর্টে অনেক ঘটনা উঠে এসেছে। আমরা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মর্যাদা পেয়েছি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, রবীন্দ্রনাথ বাদ দিয়ে বাংলা সাহিত্যের চর্চা কিভাবে করা যায় একসময় প্রশ্ন উঠেছিল। নজরুলকে মুসলিম আখ্যা দিয়ে শ্মশান থেকে গোরস্থানে নিয়ে যাওয়া হল।
তিনি বলেন, আগে প্রত্যেকটা মামলার রায় ইংরেজিতে লেখা হতো। যারা ইংরেজি পড়তে পারে না তারা অবশ্যই বোঝে না। সে কারণেই বাংলা ভাষায় রায় লেখা শুরু হয়ে গেছে। এই ব্যবস্থাটা করা হয়েছে। সব ক্ষেত্রেই আমাদের এই উদ্যোগ নেওয়া উচিত।
তিনি আরও বলেন, শুধু আমরা অর্থনীতি চিন্তা ভাবনা করি তা নয় সাংস্কৃতিক বিকাশ যাতে ঘটে সে ব্যবস্থাটা আমাদের নেওয়া উচিত। একটা কথা বললে চলবে না। আজকে আমরা বাংলা ভাষায় কথা বলছি এটা কিন্তু বিভিন্ন ঘাত প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে এসেছে। ভাষার অধিকার থেকেই আমাদের স্বাধীনতা। কাজেই এই স্বাধীনতা যেমন সুফলটা জনগণের মধ্যে পৌঁছে দিতে হবে তেমনি ভাষায় জনগণের মাঝে মধ্যে পৌঁছে দিতে হবে।
সরকার প্রধান বলেন, তত্ত্বাবধায়ক আসলে মহাভারতের অশুদ্ধ হবে না ঠিক, কিন্তু অশুদ্ধ হবে সংবিধান। অশুদ্ধ হবে জনগণের জীবন মানে। গত ২০০৮ সালের নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে ত্রিশটা পেয়েছিল বিএনপি। আর বাকি সব মহাজোট পেয়েছিল। ২০০৯ থেকে ২০৩০ পর্যন্ত দীর্ঘ সময় সরকারে আছি বলেই সাহিত্য চর্চা বৃদ্ধি পাচ্ছে, উন্নয়ন বৃদ্ধি পেয়েছে, লেখা পড়ার মান বাড়ছে। আসলে মনে শান্তি না থাকলে সাহিত্যচর্চা হয় না। অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। অর্থনৈতিক উন্নয়নটা কিভাবে হবে সেই ভাবে পদক্ষেপ নিয়েছি। যেহেতু আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক দলটি ৪৯ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধীনতা সংগ্রাম পর্যন্ত এই দল সংগ্রাম করেছে। এই সংগ্রাম এখনো চালিয়ে যাচ্ছে। বিশ্ব দরবারে যেন মর্যাদা নিয়ে চলতে পারি সেটি আমাদের দায়িত্ব। এখানে আমরা ক্ষমতা ভোগ করতেও আসেনি। ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে আসিনি। করোনা না আসলে আমরা আরও দুই ভাগ এগিয়ে থাকতাম। এখন আবার বেশি ক্ষতি করছে ইউক্রেন রাশিয়া যুদ্ধ। বিশ্বব্যাপী যখন খাদ্য মন্দা। বাংলাদেশে যেন মন্দা না আসে সেজন্য কৃষিতে সবচাইতে বেশি ভর্তুকি দিচ্ছি। হতদরিদ্রদের মধ্যে বিনামূল্যে খাদ্য সহযোগিতা দিয়ে আসছি। আমাদের খাদ্য নিরাপত্তা সবসময় নিশ্চিত রাখতে হবে।
তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক ধারাটা যাতে অব্যাহত থাকে তার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে যাচ্ছি। পঞ্চম সংশোধনী করেছিলাম বলেই বাংলাদেশ আজকে স্থিতিশীলতা আছে। বিএনপি জামায়াত জ্বালাও পোড়াও করে মানুষের ক্ষতি করে, প্রায় তিন হাজার জীবন্ত মানুষকে পুড়িয়েছে। প্রায় ৫০০ জন মারা গেছে। সবকিছু মোকাবেলা করেও অর্থনীতি সচল রাখতে সক্ষম হয়েছি। দেশে কিছু লোক আছে তাদের দেশের স্থিতিশীলতা ভালো লাগেনা। মানুষ যেন স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারে আমরা সেটাই চাই। আমাদের প্রচেষ্টাই থাকে জনগণের জন্য কাজ করা। সেভাবে কাজ করে যাচ্ছি। ভূমিহীনদের ঘর করে দিয়েছি, হিজরা, হরিজনদের ও ঘর করে দিয়েছি। সাক্ষরতার হার ৭৫ দশমিক পাঁচ ভাগের উন্নত করেছে। একটা স্থিতিশীল পরিবেশকে নষ্ট করার অনেক চক্রান্ত হবে। রাশিয়া ও ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে স্যাংশন, পাল্টা স্যাংশন এতে কিছু অসুবিধা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক সাহিত্য মেলা ও জেলায় জেলায় বইমেলায় সেটি অব্যাহত থাকবে। শিশুদের জন্য আকর্ষণীয় থাকা দরকার সেটি নজর দেওয়ার জন্য আহ্বান জানান সংশ্লিষ্টদের।
বাংলা একাডেমির সভাপতি কথা সাহিত্যিক সেলিনা হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন সাংস্কৃতিক বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ, সাংস্কৃতিক বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব আবুল মনসুর, বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি নুরুল হুদা, পুস্তক ও প্রকাশক সমিতির সভাপতি আরিফ হোসেন ছোটন। পরে উদ্বোধনী স্মারকে স্বাক্ষর করেন প্রধানমন্ত্রী।
