সহজে এবং কম খরচে মালয়েশিয়া যেতে প্রক্রিয়ায় ব্যাপক পরিবর্তনের আভাস
সিন্ডিকেট জটিলতার কারণে দীর্ঘসময় মালয়েশিয়ার শ্রম বাজারে বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ স্থগিত থাকার পর গত ২০২১ সালে কর্মী পাঠানো ইস্যুতে নতুন করে দুপক্ষের মধ্যে সমঝোতা সই হয়। সমঝোতার পর গত এক বছরের কিছু বেশি সময়ে মালয়েশিয়ার কয়েক লাখ কর্মীর চাহিদার বিপরীতে একাধিক জটিলতার কারণে বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত পাঠিয়েছে মাত্র ৬৬ হাজার ১৭৩ জন। এই শ্রম বাজারের জটিলতা দূর করে সহজে এবং স্বল্প খরচে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠাতে দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাইফুদ্দিন নাসুসন ইসমাইল ঢাকা সফরে এসে রোববার বলেন, অভিবাসন ব্যয় কমাতে এবং প্রক্রিয়া সহজ করতে চলতি মাসেই দুই দেশের কর্মকর্তারা বসবেন এবং আগের সই হওয়া সমঝোতার যেখানে যেখানে পরিবর্তন আনা জরুরি সেখানে সংশোধন করা হবে।
মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাইফুদ্দিন নাসুসন ইসমাইল গত শনিবার ২৪ ঘণ্টার ঢাকা সফরে এসে অভিবাসন প্রক্রিয়া দ্রুত ও সহজ করতে রোববার প্রবাসী কল্যাণ ভবনে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী ইমরান আহমদের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠক শেষে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, আমরা অভিবাসন ব্যয় কমিয়ে আনতে চাই। দুই দেশের প্রতিনিধিরা এই বিষয়ে সামনের দিনে বসবে। আমরা আগের করা সমঝোতা চুক্তি নিয়ে কথা বলেছি। অভিবাসন খরচ কমাতে এবং প্রক্রিয়া দ্রুত করতে দুই দেশের প্রতিনিধিরা যাচাই-বাছাই করবেন যে আগের এমওইউতে পরিবর্তন আনার প্রয়োজন আছে কিনা? আজকের আলোচনার একটা বড় অংশ নিয়ে ছিল এই চুক্তি। মালয়েশিয়া সরকার প্রক্রিয়াকে সহজতর করতে চায় যাতে মূল লক্ষ্যে পৌঁছানো যায়। আমাদের মূল লক্ষ্য হচ্ছে, চাহিদা পূরণ করা, ব্যয় কমানো, বিদেশি কর্মীদের সম্মান রক্ষা করা। যদি বর্তমান প্রক্রিয়ায় সেই লক্ষ্যে পৌঁছানো না যায়, আমরা পরিবর্তন আনতে প্রস্তুত। সেজন্য আমরা আলোচনায় বসব। সব জায়গাতেই পরিবর্তন আসবে। যেমন আগে ভিসা অনুমোদন পেতে ২০/৩০ দিন লাগত, যা এখন সর্বোচ্চ ৩ দিনের মধ্যে হয়ে যাবে। দেশটিতে সর্বোচ্চ সংখ্যক বাংলাদেশি অভিবাসী রয়েছে জানিয়ে মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, মালয়েশিয়ায় বর্তমানে ১৫ লাখ বিদেশি কর্মী আছে। এর মধ্যে সাড়ে চার লাখ বাংলাদেশি কর্মী। সেই কারণেই বাংলাদেশ ১৫টি সোর্স কান্ট্রির মধ্যে প্রথম স্থানে আছে।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী ইমরান আহমদ বলেন, আমাদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট যা যা আছে সব কথাই মালয়েশিয়ার মন্ত্রীর সঙ্গে হয়েছে। এখানে অভিবাসন ব্যয়ের ব্যাপার আছে, ওখানে যাওয়ার ব্যাপার আছে। সবকিছুই আলোচনা হয়েছে। একটা বিষয় মনে রাখতে হবে, এ সরকার (মালয়েশিয়ার) কিন্তু নতুন সরকার। আগের সরকারের সঙ্গে আমাদের যা কিছু কথা হয়েছে, এখন কিন্তু বিরাট একটা পরিবর্তন আসবে। এ জিনিসটা তিনি (মালয়েশিয়ার মন্ত্রী) আশ্বস্ত করেছেন। এমওইউ পরিবর্তন করার কথা আসছে। প্রয়োজন হলে আরও কিছু পরিবর্তন আসবে অথবা যাতে আরও বেশি সহজ হয়ে যায়। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কিন্তু উনি (মালয়েশিয়ার মন্ত্রী) এখনও দিতে চাচ্ছেন না। কিন্তু আমার বিশ্বাস যে দায়িত্ব নিয়ে তিনি (মালয়েশিয়ার মন্ত্রী) কথা বলেছেন, আমরা ভালো কিছুই পাব। চলতি মাসেই দুই দেশ ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠকে বসবে। সে সময় এসব বিষয়গুলো আলোচনার মাধ্যমে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। রিক্রুটিং এজেন্সির সংখ্যা বাড়ানো নিয়ে বৈঠকে আলাপ হয়েছে কিনা সাংবাদিকরা প্রশ্ন করলে সরাসরি জবাব না মন্ত্রী ইমরান বলেন, সব বিষয়েই আলাপ হয়েছে।
মালয়েশিয়ায় বসবাসরত অনিয়মিত বাংলাদেশিদের বিষয়ে দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, মালয়েশিয়ায় অনেক অনিয়মিত কর্মী আছেন। তাদেরকে রিক্যালিব্রেশন প্রোগ্রামের মধ্যে দিয়ে বৈধ করা হচ্ছে। গত ২৭ জানুয়ারি থেকে এই প্রোগ্রাম শুরু হয়েছে। এক সপ্তাহে বৈধকরণের যা অনুমোদন আমরা দিয়েছি তার ৫৫ শতাংশই বাংলাদেশি। এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে অনিয়মিত সকল বাংলাদেশিদের বৈধ করা হবে। রিক্যালিব্রেশন প্রোগ্রাম নিয়ে প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী বলেন, রিক্যালিব্রেশনে ওনারা কোনো জাত বিচার করবে না। যারা আছে ওখানে ওনারা যদি এপ্লাই করে ফিস দিয়ে, তারা তাদের লিগ্যাল করে নেবে। এছাড়া ২০১৬ তে রিহিয়ারিং স্কিম ছিল, ওটা পাঁচ বছরের ছিল। ওটার ডেট যাদের এক্সপায়ার্ড হয়ে গেছে তারাও রিক্যালিব্রেশনের মধ্য দিয়ে বৈধতা পাবে।
শ্রম বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই শ্রম বাজারে যে পুরনো সিন্ডিকেটের কারণে এক সময়ে আদালতের নির্দেশে স্থগিত হয়েছিল, এখন সেই সিন্ডিকেট আবারো সক্রিয় হওয়াতে মালয়েশিয়ার চাহিদা অনুযায়ী কর্মী পাঠাতে পারছে না বাংলাদেশ। যারা যাচ্ছে তাদের খরচও বেশি হচ্ছে। সর্বশেষ মালয়েশিয়ার সঙ্গে সমঝোতা সই হওয়ার পর সিন্ডিকেট করা মাত্র ২৫ এজেন্সিকে কাজ দেওয়া হয়। এরপর ধাপে ধাপে সিন্ডিকেটের এজেন্সি সংখ্যা বাড়িয়ে ১০০ করা হয়। অথচ দেশে বৈধ এজেন্সির সংখ্যা কমবেশি ১৭০০। যার মধ্যে বর্তমান পদ্ধতির কারণে প্রায় ১৬০০ বৈধ এজেন্সি মালয়েশিয়ায় শ্রমিক প্রেরণ করতে পারছে না। এতে মন্ত্রণালয় কর্তৃক মালয়েশিয়া যাওয়ার খরচ ৭৯,০০০ টাকা নির্ধারণ করা হলেও কর্মীদের দিতে হচ্ছে প্রায় ৪ লাখ টাকারও বেশি। এসব জটিলতায় মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠাতে সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে এবং দেশের গরীব নিরীহ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এছাড়া মালয়েশিয়ার নিয়োগ কর্তাও বর্তমান পদ্ধতিতে তার পছন্দ অনুযায়ী কর্মী নিতে পারছেন না।
নিরাপদ অভিবাসনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের রিক্রুটিং প্রক্রিয়ায় যে ক্রুটি আছে তা গত সপ্তাহে অভিবাসন বিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ দূত ফিলিপ গঞ্জালেস মোরালেসও উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, অভিবাসী কর্মীদের নিয়োগ থেকে শুরু করে দেশে ফেরা পর্যন্ত সার্বিক ক্ষেত্রে অধিকার নিশ্চিতে বাস্তবভিত্তিক শক্ত পদক্ষেপ নিতে হবে। অভিবাসী কর্মীদের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনেক ক্রুটি রয়েছে। অভিবাসী কর্মীদের প্রচুর খরচ করে বিদেশে যেতে হয়। অভিবাসীদের অধিকার নিশ্চিতে সরকার অনেক বিধি-বিধান প্রণয়ন করেছে কিন্তু এগুলো শক্তভাবে মনিটরিং করা প্রয়োজন। অভিবাসীদের দক্ষ করতে সরকার যে উদ্যোগ নিয়েছে সেখানে আরও আধুনিক ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। দক্ষতা উন্নয়ন সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য থাকা প্রয়োজন। পাশাপাশি অভিবাসীরা যেখানে যাচ্ছে, তাদের কাজের ধরনসহ সকল বিষয়ে আরও বিস্তারিত তথ্য থাকতে হবে। বাংলাদেশ সরকার প্রবাসীদের ক্ষেত্রে যে নিবন্ধন প্রক্রিয়া চালু করেছে তা খুব ভালো উদ্যোগ। কিন্তু নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় যে দালাল চক্র রয়েছে সে বিষয়ে সরকারের নিয়ন্ত্রণ এবং কঠোর নজরদারি থাকা প্রয়োজন।
বায়রার সদস্য সচিব এম টিপু সুলতান বলেন, ঢাকা সফরে মালয়েশিয়ার মন্ত্রী যেসব বিষয়ে পরিবর্তন আনার কথা বলেছেন তা ইতিবাচক। এতে এই বাজারে গতির সঞ্চার হবে। এখন আমাদের অপেক্ষা করে দেখতে হবে যে স্বল্প ব্যয়ে এবং সহজে অভিবাসন নিশ্চিতে মালয়েশিয়ার মন্ত্রীর কথা অনুযায়ী সামনের দিনে কী পরিবর্তন বা সংশোধন আনা হয়। তিনি আরও বলেন, নিয়োগ কর্তার পছন্দ অনুযায়ী বাংলাদেশের রিক্রুটিং এজেন্সি কর্মী নির্বাচন করতে পারলে বর্তমান অভিবাসন ব্যয় ৫০ শতাংশ কমে যাবে এবং কর্মীর বহির্গমন দ্রুত হবে। মালয়েশিয়ার অন্য ১৪ টি সোর্স কান্ট্রির মত বাংলাদেশের কর্মী পাঠানোর ব্যবস্থা নেয়া (প্রতিবেশী দেশ নেপালের মতো শ্রমিক পাঠানোর ব্যবস্থা নেয়া), মালয়েশিয়ান সরকারের সার্ভিস চার্জ ভুক্ত অনলাইন (এফডব্লিউসিএমসি) পদ্ধতি বাতিল করা (যা কোন দেশে প্রযোজ্য নয়) হলে প্রক্রিয়া দ্রুত ও সহজ হবে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন বলেন, মালয়েশিয়ার শ্রম বাজার নিয়ে কিছু সমস্যা আছে। সেই সমস্যার সুরাহা করে মসৃণ অভিবাসন নিশ্চিত করতেই মালয়েশিয়ার মন্ত্রী ঢাকা সফর করেন। আমার বিশ্বাস যে এই সফরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রম বাজারে প্রবেশ করতে বেশ সহজ এবং খরচ কম লাগবে।

Join the conversation